

গত বছরের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঘোষিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৫৭টি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণায় প্রথমে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে তা কমিয়ে ৩৫ শতাংশে আনা হয়।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করার শর্তে গত আগস্টে শুল্ক কমে দাঁড়ায় ২০ শতাংশ। পরে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) চুক্তি স্বাক্ষরের পর তা আরও ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
তবে চলতি মাসের ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট পারস্পরিক শুল্ক বাতিলের আদেশ দেন। এর পর বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দফায় আবারও শুল্ক আরোপ করেন। বর্তমানে নতুন শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, নতুন শুল্ক সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিকভাবে বড় চাপ তৈরি হয়নি। কারণ, অতিরিক্ত শুল্কের অর্থ পরিশোধ করেছে মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে ইতোমধ্যে পরিশোধিত বাড়তি শুল্ক ফেরত পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশি রফতানিকারকদের উদ্বেগ নেই।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন,
“ইউনিভার্সাল রেটের উপরে যে ট্যারিফ স্ট্রাকচার ছিল, এখন আমরা মূলত সেই অবস্থাতেই ফিরে গেছি। নতুন করে খারাপ হওয়ার কিছু নেই। তবে ভবিষ্যতে দেশভেদে আলাদা ট্যারিফ নির্ধারণ হতে পারে—তা নির্ভর করবে আলোচনার ওপর।”
বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের অন্যতম বৃহৎ রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র হওয়ায় বিষয়টি কৌশলগতভাবে দেখছে সরকার।
রেসিপ্রোকাল ট্যারিফকে কেন্দ্র করে স্বাক্ষরিত এআরটি চুক্তির শর্ত নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি নির্ভরতা বাড়ানো, বোয়িং উড়োজাহাজ, কৃষিপণ্য ও জ্বালানি কেনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের শর্তও যুক্ত হয়েছে।
এছাড়া কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে আমদানি সীমিত করা, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পণ্যে কোটা আরোপ না করার মতো শর্তও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন,
“চুক্তিতে কৃষি, শিল্প, সেবা, ডিজিটাল ট্রেড ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত যে শর্তগুলো রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ককেও সীমিত করতে পারে। এই অবস্থায় চুক্তি নিয়ে এগোনোর সুযোগ নেই।”
এআরটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন,
“সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ও চুক্তি আলাদা বিষয়। তবে যে নীতির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে, সেটিই আদালত স্থগিত করেছে। এখন দেখতে হবে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি কার্যকর করতে নোটিফিকেশন দেয় কি না।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার চুক্তি বাতিলের পথেই এগোচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুল্কহার ১৫ শতাংশে নামলেও মূল প্রশ্ন এখন এর স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ ট্যারিফ কাঠামো কী হবে। একই সঙ্গে এআরটি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে সরকার জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার কৌশলেই সিদ্ধান্ত নেবে—এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।