

জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তে থাকা চাপ বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন পথে হাঁটতে বাধ্য করছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রিন ফাইন্যান্স এখন আর শুধু পরিবেশবাদীদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। পরিবেশবান্ধব শিল্পে ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণা, নীতিগত প্রণোদনা এবং আন্তর্জাতিক তহবিলের আগ্রহ, সব মিলিয়ে সম্ভাবনার দরজা খুলছে। তবে সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জও কম নয়।
সবুজ অর্থনীতি মূলত এমন আর্থিক ব্যবস্থাপনা, যেখানে ঋণ, বিনিয়োগ ও বন্ডের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ শিল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা ও কার্বন নিঃসরণ কমানো, এসব খাত এর অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য গ্রিন ফাইন্যান্স শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে সবুজ শিল্প ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিশেষ ঋণ স্কিম চালু করেছে। গ্রিন রিফাইন্যান্সিং স্কিম, স্বল্প সুদের ঋণ, দীর্ঘ মেয়াদি অর্থায়ন, এসব উদ্যোগ কাগজে-কলমে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার ও বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো গ্রিন প্রজেক্টে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব পোশাক শিল্প এবং সবুজ অবকাঠামোতে বিদেশি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব শিল্পে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি পোশাক খাতে। ইতোমধ্যে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ বাংলাদেশে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন পরিবেশগত মানকে মূল্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখছেন। ফলে গ্রিন ফাইন্যান্সের মাধ্যমে-
উৎপাদন খরচ দীর্ঘমেয়াদে কমানো সম্ভব
বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো যায়
কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমিয়ে ব্র্যান্ড ইমেজ উন্নত হয়
এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি, সবুজ ইটভাটা, পানি পরিশোধন শিল্পেও বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে।
যত সম্ভাবনার কথা বলা হয়, বাস্তবে সবুজ অর্থনীতি এখনও মূলধারায় আসেনি। প্রধান সমস্যাগুলো হলো-
১. ব্যাংকিং ঝুঁকি মূল্যায়নের দুর্বলতা
অনেক ব্যাংক এখনও গ্রিন প্রকল্পের ঝুঁকি ও রিটার্ন মূল্যায়নে দক্ষ নয়। ফলে তারা প্রচলিত শিল্পে ঋণ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
২. উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতির ঘাটতি
পরিবেশবান্ধব প্রকল্প মানেই প্রযুক্তি, সার্টিফিকেশন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অনেক উদ্যোক্তা এই প্রস্তুতি ও ডকুমেন্টেশন সামলাতে পারছেন না।
৩. স্বল্পমেয়াদি লাভের মানসিকতা
গ্রিন বিনিয়োগে রিটার্ন আসে ধীরে। বাংলাদেশের শিল্পখাত এখনও স্বল্পমেয়াদি লাভকেন্দ্রিক, যা গ্রিন ফাইন্যান্সের দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে আগ্রহী হলেও তারা নীতিগত ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা চান। বাংলাদেশে নীতির পরিবর্তন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।
এ ছাড়া গ্রিন প্রকল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য ডেটা ও রিপোর্টিং কাঠামোর অভাবও বড় বাধা।
গ্রিন শিল্পায়ন শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, এটি কর্মসংস্থানের ধরনও বদলাবে। দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে। তবে প্রস্তুতি ছাড়া এই রূপান্তর হলে কর্মসংস্থানে অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিন ফাইন্যান্সকে কার্যকর করতে হলে-
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে
উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহায়তা দিতে হবে
গ্রিন প্রকল্পে কর ছাড় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে
বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল নীতি গড়ে তুলতে হবে
এগুলো ছাড়া গ্রিন ফাইন্যান্স কেবল নীতিগত ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
সবুজ অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব শিল্প বাংলাদেশের জন্য বিলাসিতা নয়; এটি একটি অবশ্যম্ভাবী অর্থনৈতিক রূপান্তর। সুযোগ আছে, বিনিয়োগ আছে, আন্তর্জাতিক আগ্রহও আছে।
কিন্তু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে না।
টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন পরিবেশ, শিল্প ও অর্থায়ন, এই তিনটি একই সমীকরণে আসে। গ্রিন ফাইন্যান্স সেই সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রশ্ন শুধু- আমরা কি সেটিকে বাস্তবে কাজে লাগাতে পারছি?