

চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) জন্য সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুমোদন করেছে সরকার। মূল বরাদ্দ থেকে ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ কমিয়ে সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের মূল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসেবে সংশোধিত এডিপিতে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কমানো হয়েছে।
হ্রাসকৃত এই অর্থের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা (১১.১১ শতাংশ) এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা (১৬.২৭ শতাংশ) হ্রাস করা হয়েছে।
নতুন সংশোধিত আকার অনুযায়ী, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা (৬৪ শতাংশ), যা আগে ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, বৈদেশিক উৎস থেকে বরাদ্দ ৮৬ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা (৩৬ শতাংশ) করা হয়েছে।
বরাদ্দ কমার কারণ
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং মন্ত্রণালয়গুলোর চাহিদা কমে যাওয়াই বরাদ্দ হ্রাসের মূল কারণ। অনেক প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক না থাকা এবং নতুন নিয়োগে বিলম্বের কারণে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া সরকার বর্তমানে বেশ কিছু বড় প্রকল্প পর্যালোচনা করছে, যার ফলে সেগুলোর বরাদ্দের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি বর্তমান বছরটি নির্বাচনের বছর হওয়ায় মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তুলনামূলক কম বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে।
খাতওয়ারি বরাদ্দের চিত্র
সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৯.২৫ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, যার পরিমাণ ২৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা (১৩.০৯ শতাংশ)।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বরাদ্দের মধ্যে রয়েছে
আবাসন ও কমিউনিটি সুবিধা ২২,৭২৯.৮১ কোটি টাকা (১১.৩৬ শতাংশ); শিক্ষা খাত ১৮,৫৪৯.৮৭ কোটি টাকা (৯.২৭ শতাংশ); স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন ১৫,১৪২.৯২ কোটি টাকা (৭.৫৭ শতাংশ)
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় কাটছাঁট
বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাবে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। এই খাতে বরাদ্দ ৭৪ শতাংশ কমিয়ে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। একইভাবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৩৫ শতাংশ কমিয়ে ১৮ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা করা হয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের বরাদ্দও ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ ২ হাজার ০১৮ কোটি টাকা থেকে ৭৩ শতাংশ কমিয়ে মাত্র ৫৪৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে ১৯ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ২১ শতাংশ বরাদ্দ কমেছে। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসম্পদ খাতে বরাদ্দ প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শীর্ষ বরাদ্দ পাওয়া মন্ত্রণালয় ও বিভাগ
মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে, যা মোট আরএডিপির ১৮.৭৭ শতাংশ। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ দ্বিতীয় (১৯,৯৪৯.৬১ কোটি টাকা) এবং বিদ্যুৎ বিভাগ তৃতীয় (১৪,৮৯৬ কোটি টাকা) অবস্থানে রয়েছে। অন্যান্য শীর্ষ বরাদ্দের তালিকায় রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (১২,০২৯.৫০ কোটি টাকা), পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় (১০,৫৩২ কোটি টাকা) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় (৮,০৫৪ কোটি টাকা)।
প্রকল্পের সংখ্যা ও বিশেষ বরাদ্দ
সংশোধিত এডিপিতে মোট প্রকল্পের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৩৩০টিতে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১,১০৮টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১২১টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প ৬৬টি। আরএডিপিতে ২৮৬টি প্রকল্প সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে।
এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তার আওতায় মোট ৩০,১৫৯.৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে পাঁচটি উন্নয়ন সহায়তা খাতের জন্য ৩,১০০ কোটি টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫৩০ কোটি টাকা এবং বিশেষ এলাকার জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; যা মিলিয়ে বিশেষ বরাদ্দের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩,৭৩০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রমতে, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর জন্য ৮ হাজার ৯৩৫.৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নের এই প্রকল্পগুলোসহ সংশোধিত এডিপির (আরএডিপি) সর্বমোট আকার দাঁড়িয়েছে ২,০৮,৯৩৫.৫৩ কোটি টাকা।