এলডিসি উত্তরণ: সুযোগের চেয়ে ঝুঁকি কেন বেশি

এলডিসি উত্তরণ: সুযোগের চেয়ে ঝুঁকি কেন বেশি
প্রকাশিত

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ: শোনায় গৌরবের, উন্নয়নের স্বীকৃতির। পরিসংখ্যানের ভাষায় এটি অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিহ্ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উত্তরণ কি বাস্তবে বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ, নাকি প্রস্তুতি ছাড়া এগোলে এটি হয়ে উঠতে পারে একধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির দরজা?

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিচার করলে দেখা যায়- সুযোগের আলোচনার আড়ালে ঝুঁকির দিকগুলোই বেশি গভীর ও বহুমাত্রিক।

এলডিসি সুবিধা হারানো: প্রতিযোগিতার কঠিন রাস্তা

এলডিসি মর্যাদার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইবিএ (EBA) সুবিধা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য উন্নত বাজারে বিশেষ ছাড়, এসবই বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির বড় ভিত্তি। উত্তরণের পর এই সুবিধা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার হবে।

এর অর্থ দাঁড়ায়, একই পণ্যে বাংলাদেশের রপ্তানিকারককে এখন শুল্ক দিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হবে ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে, যাদের উৎপাদন দক্ষতা, অবকাঠামো ও বাণিজ্য চুক্তি অনেক এগিয়ে।

রপ্তানি বৈচিত্র্যহীনতা: সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা

বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় সম্পূর্ণটাই তৈরি পোশাকনির্ভর। এলডিসি সুবিধা হারানোর পর এই একক খাতেই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে।

কিন্তু বিকল্প রপ্তানি খাত-চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য বা আইটি সেবা, এখনো সেই মাত্রায় প্রস্তুত নয়।

যাতে তারা শুল্ক -পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।

ফলে এলডিসি উত্তরণ একটি বৈচিত্র্যহীন অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

বাণিজ্য চুক্তির ঘাটতি: কূটনীতির পরীক্ষার সময়

এলডিসি অবস্থায় বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে বাজার সুবিধা পেত, উত্তরণের পর তা আর থাকবে না। তখন প্রয়োজন হবে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA, PTA)।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখনো এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে।

বাণিজ্য কূটনীতি দুর্বল থাকলে উত্তরণের পর রপ্তানি বাজার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাস্তব।

শিল্প খাতের প্রস্তুতির অভাব

উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা মানে শুধু সুযোগ নয়, বাড়তি দায়ও। শ্রমমান, পরিবেশ মান, পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ, সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে। কিন্তু দেশের বহু শিল্প এখনো এই মানদণ্ড পূরণে পিছিয়ে।

বিশেষ করে এসএমই ও রপ্তানি নির্ভর ক্ষুদ্র শিল্পগুলোর জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজস্ব চাপ ও ভোক্তা প্রভাব

এলডিসি সুবিধা হারালে আমদানিতে শুল্ক ছাড় কমবে। এর অর্থ আমদানি ব্যয় বাড়বে, যা সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে। সরকার রাজস্ব বাড়াতে শুল্ক ও করনির্ভরতা বাড়াতে পারে, যা আবার শিল্প ও ভোগব্যয়ে প্রভাব ফেলবে।

বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণের শর্ত কঠিন হবে

এলডিসি অবস্থায় স্বল্পসুদে ঋণ ও অনুদান পাওয়া তুলনামূলক সহজ। উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তার শর্ত কঠিন হবে, সুদহার বাড়বে, অনুদান কমবে। এর প্রভাব পড়বে অবকাঠামো ও সামাজিক খাতে বিনিয়োগে।

মানবসম্পদ ও উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন

উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা ধরে রাখতে প্রয়োজন উচ্চ উৎপাদনশীলতা ও দক্ষ মানবসম্পদ। কিন্তু শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। সস্তা শ্রমের সুবিধা দিয়ে যে প্রতিযোগিতা এতদিন চলেছে, উত্তরণের পর তা আর কার্যকর থাকবে না।

তাহলে সুযোগ কোথায়?

সুযোগ অবশ্যই আছে- বিনিয়োগ আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক মর্যাদা, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্বাধীনতা। কিন্তু এই সুযোগ বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রয়োজন প্রস্তুতিমূলক রূপান্তর। শুধু মর্যাদা বদলালেই অর্থনীতির কাঠামো বদলে যায় না।

শেষ কথা: প্রস্তুতি ছাড়া উত্তরণ ঝুঁকি

এলডিসি উত্তরণ একটি গন্তব্য নয়, এটি একটি সংবেদনশীল রূপান্তরের শুরু। প্রস্তুতি ছাড়া এই উত্তরণ হলে সুযোগের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য, বাণিজ্য চুক্তি, শিল্প দক্ষতা ও মানবসম্পদ, এই চার স্তম্ভে শক্ত ভিত গড়ে তুলতে না পারলে এলডিসি উত্তরণ গর্বের বদলে চাপের নাম হয়ে উঠতে পারে।

উত্তরণ তখনই সফল হবে, যখন মর্যাদার সঙ্গে সক্ষমতার সমতা তৈরি হবে, নইলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা হবে অসম, আর অর্থনীতির ওপর চাপ হবে দীর্ঘস্থায়ী।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com