বাজেটে মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে সামাজিক কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব: অর্থমন্ত্রী

বাজেটে মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে সামাজিক কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব: অর্থমন্ত্রী
প্রকাশিত

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার এখন বড় বড় মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে সামাজিক কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ দেশের সাধারণ মানুষকে অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত না করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

রোববার (১০ মে) সকালে আগারগাঁওয়ের পিকেএসএফ ভবন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘স্টেপিং ফরওয়ার্ড: দ্য ইনঅগারেশন অব রেইস সেমিনার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আগামী বাজেটে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার, শিক্ষা ও সামাজিক প্রোগ্রামে বেশি বরাদ্দ থাকবে।

আমির খসরু বলেন, যেকোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে এখন আমরা কয়েকটি বিষয়কে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করছি। প্রকল্পটি বিনিয়োগ সৃষ্টি করবে কি না, কর্মসংস্থান তৈরি করবে কি না এবং পরিবেশগত দিক বিবেচনায় তা দেশের জন্য উপযোগী কি না— এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ সরকারের টাকা মানে জনগণের টাকা, ট্যাক্সপেয়ারের টাকা। সুতরাং প্রতিটি প্রকল্পের পেছনে জবাবদিহিতা থাকতে হবে।

তিনি আরো বলেন, অতীতে অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যেগুলোর কোনো ‘ভ্যালু ফর মানি’ ছিল না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা বিনিয়োগের রিটার্ন বিবেচনা না করেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে প্রায় ১৩০০ প্রকল্প রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেসব প্রকল্প জনগণের কাজে আসবে না, কর্মসংস্থান তৈরি করবে না কিংবা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, সেসব প্রকল্প বাদ দেওয়া হবে।

অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করার বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু রাজনীতিতে গণতন্ত্র থাকলে হবে না, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র থাকতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের দেশের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফলও সবার কাছে পৌঁছাতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অনেক মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে থেকে গেছে। তাদের মূলধারায় নিয়ে আসতে সরকার কাজ করছে। এই লক্ষ্যেই সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক কর্মসূচিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে আমির খসরু বলেন, একজন নারী সারাদিন সংসার সামলান, পরিবারের সবার দেখভাল করেন, অথচ ঘর ও সমাজ কোথাও তার যথাযথ স্বীকৃতি নেই। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি তার হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হবে। এতে পরিবার ও সমাজে তার অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে। নারীরা পরিবারের বাজেট পরিচালনায় সবচেয়ে দক্ষ। তারা সীমিত আয়ের মধ্যেও সংসার চালাতে জানেন এবং সঞ্চয় করতে পারেন। তাদের হাতে অর্থ গেলে সেটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ কর্মসূচির কথাও তিনি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সব কৃষকের ব্যাংকঋণে প্রবেশাধিকার নেই। তাই সরাসরি কৃষকের হাতে সহায়তা পৌঁছে দিতে আমরা ফার্মার্স কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। এর মাধ্যমে তারা অন্তত সার ও বীজ কেনার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারবেন।

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় অত্যন্ত বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে নিজের পকেট থেকেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হয়। তাই আমরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বজনীন করার উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে। কারণ এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ ছাড়া দেশের জনশক্তিকে কার্যকর সম্পদে পরিণত করা সম্ভব নয়।

সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, দেশের কামার, কুমার, তাঁতি ও কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাজ করলেও তাদের জীবনমানের তেমন পরিবর্তন হয়নি। অথচ বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সরকার এসব খাতের মানুষের জন্য অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন সাপোর্ট, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দিতে চায়। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি গ্রাম একটি নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনে বিশেষায়িত হবে। সরকার তাদের ঋণ, প্রশিক্ষণ, ডিজাইন ও বিপণন সহায়তা দেবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।

বরিশালের শীতলপাটির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, যথাযথ ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং সাপোর্ট পেলে স্থানীয় পণ্যের মূল্য কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। জিডিপি শুধু শিল্পকারখানার মাধ্যমে হয় না। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, থিয়েটার ও সৃজনশীল শিল্পও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে থিয়েটার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিশাল অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে।

পিকেএসএফ’র ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়ন। এজন্য এনজিও ও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের উন্নয়ন কোনো একক রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। এটি পুরো জাতির বিষয়। তাই দেশের অর্থনীতিকে অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com