

একটি শিশুর নাগরিক হয়ে ওঠা শুরু হয় ভোটাধিকার দিয়ে নয়, শুরু হয় শ্রেণিকক্ষ দিয়ে। প্রশ্ন করার সুযোগ, ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা, সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ, এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতাগুলোই ধীরে ধীরে একজন শিক্ষার্থীকে সচেতন নাগরিকে রূপান্তরিত করে।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো- আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো কি সত্যিই গণতন্ত্রের অনুশীলনের জায়গা হয়ে উঠছে, নাকি কেবল আনুগত্য শেখানোর কারখানা হয়ে আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই সামনে আসে শিক্ষা ও গণতন্ত্রের মধ্যকার গভীর দূরত্ব।
বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমে নাগরিকতা, সংবিধান, রাষ্ট্রের কাঠামো, এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত।
শিক্ষার্থীরা জানে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা, জানে মৌলিক অধিকার কী। কিন্তু জানার সঙ্গে চর্চার ফারাক থেকেই যায়।
কারণ গণতন্ত্র কেবল শেখার বিষয় নয়, অনুশীলনের বিষয়।
আর সেই অনুশীলনের প্রথম ক্ষেত্র হওয়া উচিত শ্রেণিকক্ষ।
কিন্তু বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে-
প্রশ্ন করাকে অনেক সময় ‘অশালীনতা’ হিসেবে দেখা হয়
ভিন্নমত মানে শাস্তির ঝুঁকি
শিক্ষকই শেষ কথা
সিদ্ধান্ত আসে ওপর থেকে
ফলে শিক্ষার্থী গণতন্ত্র শেখে মুখস্থে, জীবনে নয়।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো কর্তৃত্বনির্ভর কাঠামো।
শিক্ষক এখানে জ্ঞানের একমাত্র উৎস, শিক্ষার্থী নীরব গ্রহীতা।
এই কাঠামোতে-
শিক্ষার্থী মতামত দিতে অভ্যস্ত হয় না
সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ শেখে না
ভিন্নমত প্রকাশকে ঝুঁকি মনে করে
ফলে সে বড় হয়ে নাগরিক হলেও, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রশ্নে নীরব থাকতে শেখে। এটি গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাস।
গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়। শ্রেণিকক্ষে গণতন্ত্র মানে-
কথা বলার সুযোগ
যুক্তি দিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ
সংখ্যাগরিষ্ঠের পাশাপাশি সংখ্যালঘুর কণ্ঠ শোনা
ভুল করলে শাস্তি নয়, আলোচনা
কিন্তু এই দক্ষতাগুলো পরীক্ষায় আসে না, নম্বরে মাপা যায় না। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় এগুলো গুরুত্ব হারায়।
যেখানে শিক্ষার মূল লক্ষ্য নম্বর ও ফলাফল, সেখানে সময় থাকে না আলোচনা বা বিতর্কের জন্য। শিক্ষকও বাধ্য হন-
সিলেবাস শেষ করতে
গাইডনির্ভর পড়াতে
প্রশ্ন-উত্তরমুখী ক্লাস নিতে
এই বাস্তবতায় গণতন্ত্র চর্চা হয়ে ওঠে ‘অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা’।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দেয় রাষ্ট্র।
এক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংগঠন ছিল নাগরিক নেতৃত্ব তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
আজ সেখানে-
রাজনীতির নামে নিয়ন্ত্রণ
মত প্রকাশে ভয়
অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত
ফলে শিক্ষার্থী শিখে নেয়, চুপ থাকাই নিরাপদ।
এই মানসিকতা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য মারাত্মক।
গণতন্ত্র শ্রেণিকক্ষে আসবে কি না, তার বড় অংশ নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর। শিক্ষক যদি-
প্রশ্নকে স্বাগত জানান
ভিন্নমতকে সম্মান করেন
সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীকে যুক্ত করেন
তাহলে শ্রেণিকক্ষই হয়ে ওঠে নাগরিকতার পাঠশালা।
কিন্তু শিক্ষক নিজেই যদি প্রশাসনিক চাপ, পরীক্ষার দায় ও কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতিতে বন্দি থাকেন, তাহলে তিনি গণতন্ত্র শেখাবেন কীভাবে?
শিক্ষার্থী যখন বছরের পর বছর এমন এক ব্যবস্থায় বড় হয় যেখানে-
কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ
প্রশ্ন করা বিরক্তিকর
সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নেয়
তখন নাগরিক হয়ে সে-
ভোট দেয়, কিন্তু প্রশ্ন করে না
অধিকার চেনে, কিন্তু দাবি তোলে না
অন্যায়ের প্রতিবাদে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে
এভাবেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক হলেও নাগরিক সংস্কৃতি দুর্বল থেকে যায়।
বাস্তবসম্মত কিছু উদ্যোগ-
শ্রেণিকক্ষে আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ
শিক্ষার্থী মতামতভিত্তিক মূল্যায়ন
ক্লাসরুমে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত
শিক্ষকদের জন্য গণতান্ত্রিক শিক্ষাপদ্ধতির প্রশিক্ষণ
শিক্ষার্থী সংগঠনের স্বাধীন ও নিরাপদ পরিবেশ
গণতন্ত্র শেখাতে আলাদা বই লাগে না, লাগে মানসিকতা।
গণতন্ত্র ভোটকেন্দ্রে জন্মায় না, জন্মায় শ্রেণিকক্ষে।
যদি শিক্ষার্থীকে ছোটবেলা থেকেই কথা বলতে না শেখানো হয়, শুনতে না শেখানো হয়, ভিন্নমতকে সহ্য করতে না শেখানো হয়—তাহলে বড় হয়ে সে কেবল নিয়ম মানা নাগরিক হবে, সচেতন নাগরিক নয়।
প্রশ্ন তাই গভীর—
আমরা কি শুধু শিক্ষার্থী তৈরি করছি, নাকি নাগরিক গড়ছি?
এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।