

শিক্ষা মানে শেখা, আর শেখার মানে সক্ষম হওয়া। অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শেখার সাফল্য মাপা হয় একটি সংখ্যায়, নম্বর দিয়ে। বছরের পর বছর এই নম্বরই হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীর মেধা, যোগ্যতা ও ভবিষ্যতের একমাত্র মানদণ্ড। প্রশ্ন হলো- নম্বর কি সত্যিই সক্ষমতার নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন? নাকি এটি কেবল মুখস্থনির্ভর সাফল্যের হিসাব?
মূল্যায়নের বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যায়ন বলতে এখনো মূলত লিখিত পরীক্ষা বোঝানো হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নির্ভর করে নির্দিষ্ট উত্তরের ওপর, যেখানে-
তথ্য পুনরাবৃত্তি পুরস্কৃত হয়
বিশ্লেষণ বা সৃজনশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে
ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ সংকুচিত হয়
ফলে শিক্ষার্থী শেখে, কী লিখলে নম্বর পাওয়া যাবে, কিন্তু কেন লিখতে হবে বা বাস্তবে এর প্রয়োগ কী, সে চিন্তা গড়ে ওঠে না।
নম্বরকেন্দ্রিকতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
নম্বরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীর মধ্যে কয়েকটি নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি করে-
মুখস্থবিদ্যার ওপর অতিনির্ভরতা
পরীক্ষাভীতি ও মানসিক চাপ
প্রকৃত আগ্রহের বদলে ফলাফলের পেছনে দৌড়
ব্যর্থতাকে শেখার সুযোগ না ভেবে লজ্জা হিসেবে দেখা
এর ফলে শেখার আনন্দ হারিয়ে যায়, শিক্ষা হয়ে ওঠে এক ধরনের মানসিক বোঝা।
সক্ষমতা বলতে আমরা কী বোঝাচ্ছি
সক্ষমতা মানে কেবল তথ্য জানা নয়, বরং-
শেখা জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারা
সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করার ক্ষমতা
যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ
দলগতভাবে কাজ করা
নতুন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা
এই সক্ষমতাগুলো নম্বরের মাধ্যমে পুরোপুরি ধরা পড়ে না, অথচ জীবন ও কর্মক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
বিশ্বব্যাপী মূল্যায়ন ভাবনার পরিবর্তন
বিশ্বের বহু দেশে ইতোমধ্যে মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। সেখানে-
প্রকল্পভিত্তিক কাজ
ধারাবাহিক মূল্যায়ন
ক্লাসে অংশগ্রহণ ও উপস্থাপনা
বাস্তব সমস্যার ওপর অ্যাসাইনমেন্ট
এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক সক্ষমতা যাচাই করা হয়। পরীক্ষার ভূমিকা থাকলেও সেটি আর একমাত্র মানদণ্ড নয়।
আমাদের ক্ষেত্রে বাধা কোথায়
বাংলাদেশে সক্ষমতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালু না হওয়ার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত ও মানসিক বাধা রয়েছে-
বড় শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থী–শিক্ষক অনুপাত
প্রশিক্ষণহীন শিক্ষকতা ব্যবস্থা
ফলাফলনির্ভর সামাজিক মানসিকতা
নীতিগত উদ্যোগের ধারাবাহিকতার অভাব
ফলে সংস্কারের কথা উঠলেও বাস্তবায়ন থেমে যায় পরীক্ষাকেন্দ্রিক নিরাপদ পথেই।
কীভাবে সক্ষমতাভিত্তিক মূল্যায়নে যাওয়া সম্ভব
সংস্কার অসম্ভব নয়, যদি পরিকল্পিতভাবে এগোনো যায়-
লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি প্রকল্প ও ব্যবহারিক মূল্যায়ন
ধারাবাহিক মূল্যায়নকে চূড়ান্ত ফলাফলের অংশ করা
শিক্ষক প্রশিক্ষণে মূল্যায়ন দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা
নম্বরের বদলে দক্ষতা সূচক বা পারফরম্যান্স রিপোর্ট চালু
অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি
এই পরিবর্তন ধীরে হলেও ধারাবাহিক হতে হবে।
অভিভাবক ও সমাজের ভূমিকা
যতদিন অভিভাবক প্রশ্ন করবেন, “কত পেয়েছ?”
ততদিন শিক্ষার্থী ভাববে- “কত লিখলে কত পাবো?”
এই মানসিকতা বদলানো ছাড়া মূল্যায়ন সংস্কার সম্ভব নয়। সফলতা মানে শুধু ভালো ফল নয়, বরং শেখার সক্ষমতা, এই বোধ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
নম্বর প্রয়োজন, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। শিক্ষা যদি মানুষের জীবনের জন্য হয়, তবে মূল্যায়নও হতে হবে জীবনের উপযোগী।
এখন সময় এসেছে প্রশ্ন বদলানোর-
নম্বর কত পেলাম? নয়,
আমি কী পারি, এই শিক্ষা আমাকে কী করতে শিখিয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।