

সাহিত্যকে প্রায়ই বলা হয় সমাজের বিবেক। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই বিবেক কাদের কথা বলে?
যেসব লেখা পুরস্কৃত হয়, যেসব বই প্রকাশনার আলো পায়, আর যেসব কণ্ঠ নীরবে থেকে যায়। এই বাছাইয়ের পেছনে কি কেবল সাহিত্যমান কাজ করে, নাকি ক্ষমতার অদৃশ্য হাতও সক্রিয় থাকে? সাহিত্য যখন পুরস্কার, প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর ভেতর দিয়ে এগোয়, তখন তার গন্তব্যও কি বদলে যায়?
সাহিত্য পুরস্কার লেখকের শ্রমের স্বীকৃতি, এটাই আদর্শ ধারণা। কিন্তু বাস্তবে পুরস্কার অনেক সময় হয়ে ওঠে দিকনির্দেশক। কোন ধরনের লেখা গ্রহণযোগ্য, কোন ভাষা নিরাপদ, কোন বিষয় সময়োপযোগী, এই সব সংকেত পুরস্কারের মধ্য দিয়েই ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে নতুন লেখকরা অবচেতনে লিখতে শুরু করেন পুরস্কারযোগ্য হওয়ার হিসাব কষে। সৃষ্টিশীল ঝুঁকির জায়গায় আসে নিরাপদ ভাষা ও পরিচিত কাঠামো। সাহিত্য তখন আর প্রশ্ন তোলে না, বরং গ্রহণযোগ্য হতে শেখে।
প্রকাশনা জগৎও নিরপেক্ষ কোনো পরিসর নয়। কোন পাণ্ডুলিপি বই হবে, কোনটা থেকে যাবে ড্রয়ারে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে সাহিত্যমান ছাড়াও কাজ করে বাজার, পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক।
প্রান্তিক লেখক, ভিন্ন ভাষাভঙ্গি বা অস্বস্তিকর বিষয় নিয়ে লেখা অনেক সময় প্রকাশকের কাছে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। ফলে প্রকাশনা নিজেই হয়ে ওঠে বাছাইয়ের এক ধরনের ক্ষমতা, যা সাহিত্যের বৈচিত্র্য সীমিত করে দেয়।
ক্ষমতা এখানে কেবল রাষ্ট্র বা রাজনীতির নয়। এটি সাংস্কৃতিক ক্ষমতা, যার মধ্যে আছে সাহিত্য প্রতিষ্ঠান, পুরস্কার বোর্ড, সমালোচক গোষ্ঠী ও মিডিয়া দৃশ্যমানতা।
এই ক্ষমতার কাঠামো ঠিক করে দেয়-
কোন লেখক আলোচনায় আসবেন
কোন সাহিত্য ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত হবে
কোন কণ্ঠ দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তে থাকবে
এভাবে সাহিত্য ধীরে ধীরে একটি অভিজাত বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রায়ই আড়ালে থাকে, পাঠক। সাহিত্য কি আদৌ পাঠকের জন্য লেখা হচ্ছে, নাকি প্রতিষ্ঠানের জন্য? যখন লেখা বোঝার চেয়ে স্বীকৃতি পাওয়াই মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন পাঠক ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
পাঠকের সঙ্গে সংযোগ হারানো সাহিত্য নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অনেক লেখককে প্রকাশনার বিকল্প দিয়েছে। কিন্তু এখানেও ক্ষমতা নতুন রূপে হাজির, লাইক, শেয়ার, অ্যালগরিদম। জনপ্রিয়তা কখনো কখনো সাহিত্যমানকে ছাপিয়ে যায়।
ফলে সাহিত্যের সংকট বদলায়, কিন্তু পুরোপুরি মেটে না।
পুরোপুরি নিরপেক্ষ সাহিত্য হয়তো অসম্ভব। কিন্তু সচেতনতা জরুরি। লেখক যদি জানেন তিনি কোন কাঠামোর ভেতরে লিখছেন, তাহলে তিনি অন্তত সেই কাঠামোকে প্রশ্ন করতে পারেন।
সাহিত্য তখন ক্ষমতার অংশ না হয়ে ক্ষমতার সমালোচক হতে পারে।
সাহিত্যের বৈচিত্র্য ও সততা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন-
পুরস্কার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও বহুত্ব
প্রান্তিক লেখকের জন্য প্রকাশনার সুযোগ
সমালোচনায় একক ধারার বাইরে যাওয়া
পাঠক-লেখক সংলাপ জোরদার করা
সর্বোপরি, সাহিত্যকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে।
সাহিত্য শেষ পর্যন্ত কাগজে লেখা কিছু শব্দ নয়; এটি সমাজের সঙ্গে এক ধরনের সংলাপ। যদি সেই সংলাপ কেবল ক্ষমতাবানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সাহিত্য তার মৌলিক দায়িত্ব হারায়।
প্রশ্ন তাই থেকেই যায়-
আজকের সাহিত্য কার জন্য লেখা হচ্ছে? ক্ষমতার জন্য, নাকি মানুষের জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই সমকালীন সাহিত্যচর্চার সবচেয়ে জরুরি কাজ।