

ডিগ্রি আছে, কিন্তু জীবনের প্রস্তুতি কতটা?
শিক্ষা মানুষের জীবনকে সহজ, সচেতন ও সক্ষম করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বছরের পর বছর শিক্ষার্থী তৈরি করছে ঠিকই, মানুষ তৈরি করতে পারছে কতটা, সে প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে। পরীক্ষায় ভালো ফল, সনদ ও ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্র, সামাজিক জীবন কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে বহু শিক্ষার্থী হিমশিম খাচ্ছে। এই ব্যবধানের মূল কারণ একটাই- শিক্ষা ব্যবস্থায় জীবনমুখী দক্ষতার দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি।
জীবনমুখী দক্ষতা বলতে কী বোঝায়
জীবনমুখী দক্ষতা মানে শুধু চাকরির দক্ষতা নয়। এর মধ্যে পড়ে-
যোগাযোগ ও প্রকাশের ক্ষমতা
সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা
সমস্যা সমাধান ও সমালোচনামূলক চিন্তা
সময় ব্যবস্থাপনা
আর্থিক সচেতনতা
দলগত কাজ ও নেতৃত্ব
মানসিক স্থিতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ
এই দক্ষতাগুলো বই মুখস্থ করে শেখা যায় না, কিন্তু জীবন পরিচালনার জন্য এগুলো অপরিহার্য।
আমাদের শিক্ষা কোথায় সীমাবদ্ধ
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও সিলেবাস-নির্ভর। এখানে শিক্ষার্থীর সাফল্য নির্ধারিত হয় নম্বর দিয়ে, দক্ষতা দিয়ে নয়।
ফলে শিক্ষার্থী শেখে-
কী লিখলে নম্বর পাওয়া যাবে
কী মুখস্থ করলে পাশ করা যাবে
কিন্তু শেখে না-
বাস্তব সমস্যার সমাধান কীভাবে করতে হয়
ভিন্নমত গ্রহণ বা যুক্তি দিয়ে কথা বলতে হয় কীভাবে
ব্যর্থতা সামলাতে হয় কীভাবে
শিক্ষা হয়ে ওঠে কাগজে সফলতার গল্প, জীবনে নয়।
শ্রেণিকক্ষ বাস্তবতা: বলার সুযোগ নেই, ভাবার সময় নেই
আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো মূলত একমুখী। শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থী শোনে। প্রশ্ন করা, মত প্রকাশ বা বিতর্কের সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষার্থী নিষ্ক্রিয় শেখায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
জীবনমুখী দক্ষতা বিকাশের জন্য দরকার অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা—যেখানে শিক্ষার্থী চিন্তা করবে, প্রশ্ন করবে, ভুল করবে, আবার শিখবে। কিন্তু পরীক্ষার চাপের কারণে সেই জায়গাটি তৈরি হয় না।
উচ্চশিক্ষায়ও সংকট একই
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে সমস্যার সমাধান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে দেখা যায়-
প্রেজেন্টেশন ও গবেষণার নাম করে কপি-নির্ভর কাজ
মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা
বাস্তব দক্ষতার বদলে ডিগ্রিকেন্দ্রিক মানসিকতা
ফলে একজন গ্র্যাজুয়েট কর্মক্ষেত্রে গিয়ে বুঝতে পারে, সে অনেক কিছু পড়েছে, কিন্তু অনেক কিছু করতে শেখেনি।
কর্মক্ষেত্র ও সমাজে এর প্রভাব
জীবনমুখী দক্ষতার অভাব সরাসরি প্রভাব ফেলে-
বেকারত্ব ও কর্মক্ষেত্রে অযোগ্যতার অনুভূতিতে
যোগাযোগ দুর্বলতার কারণে পেশাগত সংকটে
সিদ্ধান্তহীনতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে
সামাজিক দ্বন্দ্ব ও সহনশীলতার অভাবে
এর ফলে শিক্ষিত হয়েও অনেক তরুণ নিজেকে সমাজে অপ্রস্তুত মনে করে।
অভিভাবক ও সমাজের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে
এই সংকটের দায় শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার নয়। অভিভাবক ও সমাজও ফলাফলকেই সফলতার একমাত্র মানদণ্ড বানিয়ে ফেলেছে। সন্তানের নম্বর ভালো হলেই শিক্ষা সফল, এই ধারণা জীবনমুখী দক্ষতাকে গৌণ করে তুলেছে।
ফলে বিদ্যালয়ও বাধ্য হয় ফলাফল-দৌড়ে শামিল হতে, দক্ষতা উন্নয়নের ঝুঁকি নিতে চায় না।
কীভাবে জীবনমুখী শিক্ষা ফিরিয়ে আনা যায়
সমাধান সম্ভব, যদি আমরা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই-
পাঠ্যক্রমে যোগাযোগ, আর্থিক ও মানসিক দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা
মূল্যায়নে কেবল লিখিত পরীক্ষা নয়, দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন
শ্রেণিকক্ষে আলোচনা, বিতর্ক ও প্রকল্পভিত্তিক শেখা
শিক্ষকদের জীবনমুখী প্রশিক্ষণ
শিক্ষার্থীর ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ
শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত না করলে, শিক্ষা কেবল সনদ উৎপাদনের কারখানা হয়েই থাকবে।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে কেবল কতজন শিক্ষিত তার ওপর নয়, বরং তারা জীবন সামলাতে কতটা সক্ষম, তার ওপর। জীবনমুখী দক্ষতাহীন শিক্ষা সমাজে হতাশ, অনিশ্চিত ও আত্মবিশ্বাসহীন প্রজন্ম তৈরি করে।
আমরা কত পড়াচ্ছি, তা আর এখন প্রশ্ন নয়,
প্রশ্ন হলো- আমরা কি জীবনের জন্য প্রস্তুত মানুষ গড়তে পারছি?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য।