

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর সংকটটি লুকিয়ে আছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ভেতরে। এরা না দরিদ্র, যাদের জন্য সহানুভূতি ও কোটা থাকে। না ধনী, যাদের জন্য সুযোগ সহজলভ্য।
এই মাঝামাঝি অবস্থান থেকেই মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো শিক্ষা নিয়ে এক অদ্ভুত দোটানায় পড়ে- উচ্চাশা প্রবল, কিন্তু বাস্তবতার সীমা কঠোর।
এই দোটানাই আজ মধ্যবিত্ত শিক্ষার সবচেয়ে বড় চাপ।
মধ্যবিত্তের কাছে শিক্ষা শুধু জ্ঞানার্জন নয়, এটি সামাজিক নিরাপত্তার একমাত্র হাতিয়ার।
জমিজমা নেই
ব্যবসায়িক পুঁজি নেই
রাজনৈতিক প্রভাব নেই
ফলে শিক্ষাই একমাত্র সিঁড়ি, যেটা ধরে পরিবারটি সামাজিকভাবে টিকে থাকতে চায়, বা ওপরে উঠতে চায়।
এই কারণেই মধ্যবিত্ত পরিবারে শিক্ষাকে ঘিরে থাকে-
অতিরিক্ত প্রত্যাশা
তুলনামূলক চাপ
‘ভালো রেজাল্টই সব’, এই বিশ্বাস
শিক্ষার্থী বড় হয় স্বপ্নের ভার কাঁধে নিয়ে।
নীতিগতভাবে শিক্ষা সবার জন্য সমান। বাস্তবে তা নয়।
মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থী দেখে-
ভালো স্কুল মানে ব্যয়বহুল
মানসম্মত কোচিং মানে অতিরিক্ত খরচ
বিদেশে পড়াশোনা মানে অসম্ভব স্বপ্ন
কিন্তু একই সঙ্গে তাকে বলা হয়-
“তোমাকে সেরা হতে হবে।”
এই বৈপরীত্যই জন্ম দেয় গভীর মানসিক চাপ।
মধ্যবিত্তের সামনে শিক্ষায় পছন্দের সুযোগ সীমিত।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে আসন সীমিত ও প্রতিযোগিতা ভয়াবহ
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মান আছে, কিন্তু খরচ অসহনীয়
ফলে মধ্যবিত্ত পরিবার চলে ঝুঁকিপূর্ণ সমঝোতার পথে-
কম মানে বেশি খরচ, বা কম খরচে অনিশ্চিত মান।
এই সমঝোতার বোঝা বহন করে শিক্ষার্থী।
মধ্যবিত্ত পরিবার জানে, কোচিং ছাড়া ভালো ফল কঠিন।
আবার এটাও জানে, কোচিংয়ের খরচ সংসার টানাটানিতে ফেলে।
ফলে-
শিক্ষার্থী অতিরিক্ত চাপের মধ্যে পড়ে
পরিবার আর্থিকভাবে চাপে পড়ে
শেখা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক
কোচিং এখানে সহায়ক নয়, বাধ্যতামূলক ব্যয়।
মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীর বড় ধাক্কা আসে উচ্চশিক্ষার পর।
ভালো ডিগ্রি আছে
দক্ষতা সীমিত
চাকরির বাজার সংকুচিত
ফলে শিক্ষার্থী বুঝতে পারে- শুধু ডিগ্রি যথেষ্ট নয়, কিন্তু এই কথাটি সে শিখেছে অনেক দেরিতে।
এই হতাশা অনেক সময় আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।
মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থী জানে, “আমার ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই।”
কারণ ব্যর্থ হলে-
পরিবারের বিনিয়োগ বৃথা
সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
এই চাপ থেকেই জন্ম নেয়-
উদ্বেগ
আত্মগ্লানি
তুলনামূলক হীনমন্যতা
কিন্তু এই মানসিক সংকট নিয়ে কথা বলার জায়গা নেই।
এই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর, কিন্তু জরুরি।
যদি শিক্ষা ব্যবস্থা-
শুধু প্রতিযোগিতা বাড়ায়
কিন্তু সহায়তা না দেয়
সুযোগের বৈষম্য কমাতে ব্যর্থ হয়
তাহলে মধ্যবিত্তের কাছে শিক্ষা হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ, উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়।
মধ্যবিত্তের জন্য-
লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নেই
শিক্ষা ঋণ কার্যকর নয়
ক্যারিয়ার গাইডেন্স দুর্বল
দক্ষতা ও শিক্ষার সংযোগ দুর্বল
ফলে মধ্যবিত্ত পড়ে থাকে নীতির অন্ধকার জায়গায়।
বাস্তবসম্মত কিছু করণীয়-
সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়ানো
মধ্যবিত্ত-বান্ধব শিক্ষা ঋণ
স্কুল থেকেই ক্যারিয়ার গাইডেন্স
দক্ষতাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা
মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা
সবচেয়ে জরুরি- শিক্ষাকে শুধু ফলাফলের নয়, সম্ভাবনার পথ হিসেবে দেখা।
মধ্যবিত্তের দোটানা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকট। শিক্ষা যদি সত্যিই সামাজিক গতিশীলতার হাতিয়ার হয়, তাহলে মধ্যবিত্তের এই দোটানা কমাতে হবে।
না হলে শিক্ষা মধ্যবিত্তকে উপরে তুলবে না-
বরং তাকে অনিশ্চয়তার মাঝখানে ঝুলিয়ে রাখবে।
প্রশ্ন তাই গভীর-
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি স্বপ্ন দেখাতে জানে, নাকি শুধু চাপ দিতে জানে?
এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে মধ্যবিত্তের ভবিষ্যৎ, এবং দেশেরও।