শিক্ষায় প্রযুক্তি: সহায়ক না বিকল্প?

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সহজলভ্যতায় কি শেখার গভীরতা কমছে?
শিক্ষায় প্রযুক্তি: সহায়ক না বিকল্প?
প্রকাশিত

এক দশক আগেও শ্রেণিকক্ষ মানে ছিল খাতা–কলম, বোর্ড আর শিক্ষকের উপস্থিতি। আজ সেখানে ঢুকে পড়েছে স্মার্টবোর্ড, ট্যাব, ইউটিউব লিংক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। 

প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি শিক্ষাকে সহায়তা করছে, নাকি ধীরে ধীরে শিক্ষক ও গভীর শেখার জায়গা দখল করে নিচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক নয়। কারণ প্রযুক্তি যেমন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে এক নতুন শিক্ষাগত সংকট।

প্রযুক্তি শিক্ষায় কী বদলে দিয়েছে

শিক্ষায় প্রযুক্তির প্রবেশ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটি-

  • শেখার উপকরণ সহজলভ্য করেছে

  • দূরবর্তী ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের যুক্ত করেছে

  • ভিজ্যুয়াল ও ইন্টারঅ্যাকটিভ শিক্ষার সুযোগ দিয়েছে

  • তথ্যের গতি বাড়িয়েছে

কোভিড, পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি না থাকলে শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ত। এ বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন সহায়ক প্রযুক্তি ধীরে ধীরে বিকল্প হয়ে উঠতে থাকে।

সহায়ক থেকে বিকল্প-এই রূপান্তরের ঝুঁকি

প্রযুক্তি যখন শিক্ষকের হাতিয়ার থাকে, তখন তা শক্তি।

কিন্তু যখন প্রযুক্তিই শিক্ষক হয়ে উঠতে চায়, তখনই বিপত্তি।

বর্তমানে অনেক শ্রেণিকক্ষে দেখা যায়-

  • শিক্ষক কম কথা বলেন, ভিডিও বেশি চলে

  • আলোচনার জায়গায় স্লাইড

  • প্রশ্নের জায়গায় গুগল সার্চ

  • বোঝার জায়গায় “কপি-পেস্ট”

ফলে শেখা হয়ে ওঠে দ্রুত, কিন্তু গভীর নয়।

শেখার গভীরতা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

গভীর শেখা (Deep Learning) মানে শুধু তথ্য জানা নয়; বরং-

  • বিশ্লেষণ করা

  • যুক্তি তৈরি করা

  • প্রশ্ন তোলা

  • ভুল করে শেখা

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় এই জায়গাগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।

কারণ-

  • শিক্ষার্থী অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে তাৎক্ষণিক উত্তরে

  • ধৈর্য ও মনোযোগ কমছে

  • দীর্ঘ পাঠ বা চিন্তা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে

  • মুখস্থ নয়, ভাবনার চর্চাও দুর্বল হচ্ছে

এক ক্লিকেই উত্তর পেলে প্রশ্ন নিয়ে বসে থাকার প্রয়োজন পড়ে না।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ক্ষয়

শিক্ষা শুধু কনটেন্ট নয়, এটি সম্পর্কও।

শিক্ষকের চোখের ভাষা, প্রশ্ন করার ভঙ্গি, ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মানসিকতা, এসব প্রযুক্তি দিতে পারে না।

যখন শেখা স্ক্রিনকেন্দ্রিক হয়ে যায়-

  • শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংলাপ কমে

  • শ্রেণিকক্ষের প্রাণশক্তি হারায়

  • শিক্ষার্থী একা হয়ে পড়ে নিজের স্ক্রিনের সামনে

ফলে শেখা হয় ব্যক্তিগত, কিন্তু বিচ্ছিন্ন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংকট আরও গভীর

বাংলাদেশে প্রযুক্তি ব্যবহারে বৈষম্য প্রকট-

  • শহরে স্মার্ট ক্লাস, গ্রামে দুর্বল নেটওয়ার্ক

  • ডিভাইস আছে, কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতা নেই

  • শিক্ষক প্রশিক্ষণ সীমিত, চাপ বেশি

ফলে প্রযুক্তি অনেক সময় শেখাকে সহজ না করে অপরিকল্পিত চাপ তৈরি করে।

এখানে প্রযুক্তি শিক্ষার সমতা বাড়ানোর বদলে কখনো কখনো বৈষম্যও বাড়ায়।

প্রযুক্তি কি শেখার শত্রু?

উত্তর- না।

প্রযুক্তি সমস্যা নয়, অতিরিক্ত নির্ভরতা ও ভুল প্রয়োগই সমস্যা।

প্রযুক্তি সবচেয়ে কার্যকর হয় যখন-

  • এটি প্রশ্ন তৈরি করে, উত্তর দেয় না

  • শিক্ষকের ভূমিকা শক্তিশালী করে

  • শিক্ষার্থীকে ভাবতে বাধ্য করে

  • শ্রেণিকক্ষের আলোচনাকে সমৃদ্ধ করে

প্রযুক্তি হবে মানচিত্র, পথচলা করবে মানুষ।

উত্তরণের পথ: ভারসাম্যের শিক্ষা

গভীর শেখা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন-

  • প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা

  • শিক্ষককে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রাখা

  • আলোচনা, লেখালেখি ও বিশ্লেষণের সুযোগ বাড়ানো

  • স্ক্রিন-নির্ভরতার সীমা নির্ধারণ

  • ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নৈতিকতা শেখানো

শিক্ষা মানে শুধু দ্রুত শেখা নয়, ধীরে ভাবার সুযোগও দেওয়া।

প্রযুক্তি শিক্ষার দরজা খুলেছে, কিন্তু গভীর শেখার জানালা খুলে রাখার দায়িত্ব আমাদের। যদি প্রযুক্তি আমাদের ভাবতে না শিখিয়ে শুধু দেখতেই শেখায়, তাহলে শিক্ষা হবে তথ্যসমৃদ্ধ কিন্তু চিন্তাশূন্য।

প্রশ্ন তাই স্পষ্ট-

প্রযুক্তি কি আমাদের শেখাচ্ছে, নাকি ভাবা থেকে দূরে সরাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ শিক্ষার দিশা।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com