

শিক্ষাকে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক গতিশীলতার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। ধারণা ছিল, শিক্ষা দরিদ্রকে দরিদ্রতা থেকে বের করে আনবে, শ্রেণি ব্যবধান কমাবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। একই শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতর থেকেও একদল শিক্ষার্থী এগিয়ে যাচ্ছে, আরেক দল ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। প্রশ্ন তাই স্পষ্ট- শিক্ষা কি সত্যিই বৈষম্য ভাঙছে, নাকি নীরবে সেটাকেই পুনরুৎপাদন করছে?
শ্রেণিচেতনা বলতে বোঝায় সমাজে কার অবস্থান কোথায়, এই বোধ। শিক্ষা নিরপেক্ষ বলে মনে হলেও বাস্তবে এটি শ্রেণি–নিরপেক্ষ নয়। শিক্ষার্থীর পারিবারিক পটভূমি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক মূলধন তার শেখার সুযোগকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
একজন দরিদ্র শিক্ষার্থী স্কুলে আসে কেবল বই নিয়ে, কিন্তু একজন সচ্ছল শিক্ষার্থী আসে কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, প্রযুক্তি ও সামাজিক নেটওয়ার্কসহ। একই সিলেবাসে পড়লেও তাদের শেখার বাস্তবতা এক নয়।
দরিদ্র শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় বাধা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। পরিবারে আয় কম, কাজের চাপ বেশি, কখনো কখনো পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জনের দায়। ফলে-
পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়
ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য গড়ে ওঠে না
শিক্ষা যেখানে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ, সেখানে দরিদ্র শিক্ষার্থীর কাছে তা হয়ে ওঠে বর্তমান টিকে থাকার লড়াই।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পাঠ্যবইয়ের ভাষা, উদাহরণ, এমনকি শিক্ষকের প্রত্যাশাও অনেক সময় দরিদ্র শিক্ষার্থীর জীবন–অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না।
এর ফল-
শ্রেণিকক্ষে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করা
প্রশ্ন করতে ভয় পাওয়া
ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারানো
এই মানসিক ব্যবধান ফলাফলের ব্যবধানকে আরও গভীর করে।
বিনামূল্যের শিক্ষা বললেও বাস্তবে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকে নানা গোপন খরচ- কোচিং, গাইড বই, পরীক্ষার ফি, ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস। সচ্ছল শিক্ষার্থীর জন্য এগুলো স্বাভাবিক, দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য প্রায় অপ্রাপ্য।
ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরেই তৈরি হয় এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল। যা সবার চোখে পড়ে না, কিন্তু দরিদ্র শিক্ষার্থী প্রতিদিন সেটির মুখোমুখি হয়।
নম্বরনির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কঠিন। কারণ-
মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে সময় ও সহায়তা লাগে
পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ সামলানোর মানসিক প্রস্তুতি কম থাকে
সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থী ফলাফলে পিছিয়ে পড়ে, আর সেই ফলাফলই তার ভবিষ্যৎ সীমিত করে দেয়।
যখন ভালো স্কুল, ভালো শিক্ষক ও ভালো সুযোগ মূলত নির্দিষ্ট শ্রেণির নাগালে থাকে, তখন শিক্ষা বৈষম্য কমানোর বদলে সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। দরিদ্র শিক্ষার্থী একই প্রতিযোগিতায় নামলেও শুরুতেই থাকে কয়েক ধাপ পিছিয়ে।
এভাবে শিক্ষা সামাজিক গতিশীলতার বদলে অনেক সময় শ্রেণি অবস্থানকে স্থায়ী করে তোলে।
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্রেণি-সংবেদনশীল হতে হবে-
দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা
বিদ্যালয়ে মানসিক ও একাডেমিক কাউন্সেলিং
কোচিং নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যালয়কেন্দ্রিক শেখা
মূল্যায়নে সক্ষমতা ও অগ্রগতি বিবেচনা
শিক্ষক প্রশিক্ষণে সামাজিক বৈষম্য বিষয়ে সচেতনতা
শুধু অবকাঠামো নয়, দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কার জরুরি।
শিক্ষা তখনই মুক্তির হাতিয়ার হয়, যখন তা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে। অন্যথায় শিক্ষা হয়ে ওঠে বৈষম্যের নীরব বাহক। দরিদ্র শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে মেধার অভাবে নয়, বরং ব্যবস্থাগত সীমাবদ্ধতার কারণে।
প্রশ্ন তাই আর শুধু শিক্ষা বিস্তার নয়-
প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষা কাদের এগিয়ে নিচ্ছে, আর কাদের পেছনে ফেলে রাখছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হবে প্রকৃত শিক্ষা সংস্কারের শুরু।