শিক্ষায় প্রতিযোগিতা বনাম সহযোগিতা: আমরা কোন মানুষ তৈরি করছি?

শিক্ষায় প্রতিযোগিতা বনাম সহযোগিতা: আমরা কোন মানুষ তৈরি করছি?
প্রকাশিত

আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রে আজ একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব,

আমরা কি শিক্ষার্থীদের একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে শেখাচ্ছি,

নাকি সহযোগিতার মাধ্যমে একসঙ্গে এগোতে শেখাচ্ছি?

এই প্রশ্নটি শুধু শিক্ষানীতির নয়; এটি ভবিষ্যৎ সমাজ, নাগরিক চরিত্র এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্ন। কারণ শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষই তৈরি করে, কিন্তু কেমন মানুষ?

প্রতিযোগিতা: অগ্রগতির ইঞ্জিন, না মানসিক চাপের উৎস?

প্রতিযোগিতা শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন নয়। ভালো ফল, মেধা তালিকা, ভর্তি পরীক্ষা, সবকিছুই প্রতিযোগিতার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে।

প্রতিযোগিতার ইতিবাচক দিকগুলো হলো-

  • লক্ষ্য নির্ধারণে স্পষ্টতা

  • পরিশ্রমে উদ্দীপনা

  • ব্যক্তিগত সক্ষমতা যাচাই

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে শিক্ষার একমাত্র ভাষা।

তখন-

  • শেখার আনন্দ হারিয়ে যায়

  • সহপাঠী হয়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বী

  • ব্যর্থতা মানে ব্যক্তিগত অযোগ্যতা

শিক্ষার্থী শেখে জিততে, কিন্তু একসঙ্গে থাকতে শেখে না।

সহযোগিতা: উপেক্ষিত কিন্তু মৌলিক দক্ষতা

অথচ বাস্তব জীবন খুব কমই একক প্রতিযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সমাজ চলে-

  • দলগত সিদ্ধান্তে

  • পারস্পরিক নির্ভরতায়

  • সহানুভূতি ও যোগাযোগের মাধ্যমে

এই দক্ষতাগুলো আসে সহযোগিতামূলক শিক্ষার মাধ্যমে।

সহযোগিতা শেখায়-

  • ভিন্নমত গ্রহণ

  • দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া

  • অন্যের সাফল্যে আনন্দ পাওয়া

কিন্তু আমাদের শ্রেণিকক্ষে এই গুণগুলো চর্চার জায়গা খুব সীমিত।

ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষা: মানুষ নয়, স্কোর তৈরি

বর্তমান শিক্ষা কাঠামোতে সাফল্য মাপা হয়-

  • নম্বর

  • র‍্যাংক

  • GPA

ফলে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করে না-

“আমি কী শিখলাম?”

সে প্রশ্ন করে-

“আমি কয় নম্বর পেলাম?”

এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে এমন মানুষ তৈরি করে-

  • যারা তুলনায় অভ্যস্ত

  • সহানুভূতিতে দুর্বল

  • ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে

মানুষ হিসেবে নয়, সে নিজেকে দেখে একটি পারফরম্যান্স ইউনিট হিসেবে।

প্রতিযোগিতার সামাজিক প্রভাব: সহমর্মিতার সংকট

শিক্ষায় অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা সমাজে কিছু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে-

  • অন্যের দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে দেখা

  • সহযোগিতাকে দুর্বলতা মনে করা

  • সফলতাকে ব্যক্তিগত অর্জন, ব্যর্থতাকে লজ্জা হিসেবে দেখা

ফলে আমরা এমন নাগরিক তৈরি করি, যারা-

  • দক্ষ কিন্তু সংবেদনশীল নয়

  • মেধাবী কিন্তু মানবিক নয়

এটি একটি বিপজ্জনক সমন্বয়।

সহযোগিতামূলক শিক্ষা কেন পিছিয়ে?

সহযোগিতামূলক শিক্ষা বাস্তবায়নে কয়েকটি কাঠামোগত বাধা আছে-

  • বড় ক্লাসরুম

  • ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন

  • শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি

  • পরীক্ষাকেন্দ্রিক সিস্টেম

সহযোগিতা শেখাতে সময় লাগে, ধৈর্য লাগে, কিন্তু আমাদের সিস্টেম চায় দ্রুত ফল।

শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

শিক্ষকরা নিজেরাও এই দ্বন্দ্বের ভেতরে আছেন।

একদিকে-

তাদের ফলাফল দেখাতে হয়

অন্যদিকে-

তারা জানেন, শিক্ষা শুধু ফল নয়

এই দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে শ্রেণিকক্ষে মানবিক শিক্ষা সম্ভব নয়।

ভারসাম্যই কি একমাত্র পথ?

প্রশ্নটি প্রতিযোগিতা বনাম সহযোগিতা নয়;

প্রশ্নটি কী পরিমাণে কোনটি।

একটি সুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থা-

প্রতিযোগিতাকে ব্যবহার করে প্রেরণা হিসেবে

সহযোগিতাকে গড়ে তোলে সামাজিক দক্ষতা হিসেবে

এখানে-

সাফল্য ব্যক্তিগত, কিন্তু শেখা যৌথ

ফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষ আরও গুরুত্বপূর্ণ

আমরা কেমন মানুষ চাই?

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এখানে এসে দাঁড়ায়-

আমরা কি চাই, শুধু সফল পেশাজীবী?

নাকি দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল নাগরিক?

শিক্ষা যদি মানুষকে মানুষ না বানায়, তবে সেই শিক্ষা যত উন্নতই হোক, তা অসম্পূর্ণ।

শিক্ষায় প্রতিযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু একচেটিয়া নয়।

সহযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু অবহেলিত।

এই দুইয়ের ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে-

  • আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র

  • সামাজিক সম্পর্ক

  • মানবিক মূল্যবোধ

প্রশ্ন তাই কেবল নীতিনির্ধারকদের নয়, আমাদের সবার, আমরা কি শুধু জিততে জানা মানুষ তৈরি করছি,

নাকি একসঙ্গে বাঁচতে জানা মানুষ?

এই উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী সমাজের রূপরেখা।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com