শিক্ষা কি আনন্দ দিতে পারে?

শিখন-প্রক্রিয়ায় আনন্দের উপস্থিতির সংকট
শিক্ষা কি আনন্দ দিতে পারে?
প্রকাশিত

শিক্ষা কি কেবল দায়িত্ব, না কি আনন্দেরও একটি ক্ষেত্র?

এই প্রশ্নটি আজ আর দার্শনিক বিলাসিতা নয়, এটি হয়ে উঠেছে সমসাময়িক শিক্ষা সংকটের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।

কারণ বাস্তবতা হলো, আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষা মানে এখন-  চাপ, পরীক্ষা, ভয় আর নিরন্তর প্রতিযোগিতা।

শেখার সঙ্গে আনন্দের সম্পর্ক ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

শেখা ও আনন্দ: স্বাভাবিক সম্পর্কটি কোথায় হারাল?

মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতূহলী। একটি শিশু কথা বলা শেখে আনন্দে, হাঁটা শেখে খেলতে খেলতে।

শেখা তখন স্বতঃস্ফূর্ত, কারণ সেখানে আছে-

  • আবিষ্কারের আনন্দ

  • ভুল করার স্বাধীনতা

  • প্রশ্ন করার সুযোগ

কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ঢুকেই এই স্বাভাবিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে।

শেখা তখন হয়ে ওঠে-

  • সিলেবাস শেষ করার দৌড়

  • নম্বর পাওয়ার চাপ

  • ভুল মানেই শাস্তির ভয়

আনন্দ সরে গিয়ে জায়গা নেয় উদ্বেগ।

পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা: আনন্দের প্রধান প্রতিপক্ষ

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ামক হলো পরীক্ষা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- পরীক্ষা কি শেখার আনন্দ বাড়াচ্ছে, নাকি কমাচ্ছে?

বাস্তবে দেখা যায়-

  • শিক্ষার্থী শেখে পরীক্ষার জন্য, বোঝার জন্য নয়

  • শিক্ষক পড়ান ফলের জন্য, আগ্রহ তৈরির জন্য নয়

  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য মাপা হয় রেজাল্টে, শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতায় নয়

এই কাঠামোতে আনন্দের জায়গা খুবই সীমিত।

ভয় ও চাপের সংস্কৃতি

আমাদের শ্রেণিকক্ষে আনন্দের অনুপস্থিতির পেছনে একটি বড় কারণ হলো ভয়ভিত্তিক শৃঙ্খলা।

ভয়-

  • ফেল করার

  • কম নম্বর পাওয়ার

  • শিক্ষকের রাগ

  • অভিভাবকের হতাশা

এই ভয় শিক্ষার্থীকে বাধ্য করে মুখস্থ করতে, কিন্তু উৎসাহিত করে না ভাবতে। ফলাফল,  শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে ক্লাসে, কিন্তু মানসিকভাবে অনুপস্থিত।

আনন্দহীন শিক্ষা কী ধরনের মানুষ তৈরি করে?

দীর্ঘদিন আনন্দহীন শিক্ষার ভেতর দিয়ে বড় হওয়া শিক্ষার্থীরা সাধারণত-

  • শেখার প্রতি অনীহা তৈরি করে

  • কৌতূহল হারিয়ে ফেলে

  • সৃজনশীল চিন্তায় দুর্বল হয়ে পড়ে

তারা শিক্ষা শেষ করে, কিন্তু শেখার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। আজীবন শিক্ষার ধারণা এখানে ব্যর্থ হয়।

শিক্ষকও কি আনন্দ হারাচ্ছেন?

এই সংকট শুধু শিক্ষার্থীর নয়। শিক্ষকও এই ব্যবস্থার ভুক্তভোগী।

শিক্ষকের সামনে থাকে-

  • সিলেবাস শেষ করার চাপ

  • ফলাফল দেখানোর দায়

  • প্রশাসনিক নির্দেশনা

ফলে অনেক শিক্ষক নিজেরাও পড়ানোতে আনন্দ খুঁজে পান না। আনন্দহীন শিক্ষক দিয়ে আনন্দময় শিক্ষা সম্ভব নয়, এটাই বাস্তবতা।

আনন্দ মানে কি খেলাধুলা আর হালকাভাব?

এখানে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে-

অনেকেই মনে করেন, শিক্ষা আনন্দময় মানে তা গুরুত্বহীন।

বাস্তবে আনন্দময় শিক্ষা মানে-

  • অর্থবহ শেখা

  • প্রশ্ন করার স্বাধীনতা

  • বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগ

  • শেখার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ

আনন্দ মানে শৃঙ্খলার অনুপস্থিতি নয়; আনন্দ মানে মানসিক সম্পৃক্ততা।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলছে?

বিশ্বের অনেক শিক্ষা ব্যবস্থা ইতোমধ্যে বুঝেছে, শেখার আনন্দ ছাড়া টেকসই শিক্ষা সম্ভব নয়।

তারা জোর দিচ্ছে-

  • প্রকল্পভিত্তিক শেখায়

  • দলগত কাজের ওপর

  • শিক্ষার্থীর আগ্রহকেন্দ্রিক পাঠক্রমে

ফলাফল হিসেবে সেখানে দেখা যাচ্ছে,  শিক্ষার্থী শেখে গভীরভাবে, এবং শেখার সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে করণীয় কী?

বাংলাদেশের শিক্ষায় আনন্দ ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন-

  • পরীক্ষার ওপর অতিনির্ভরতা কমানো

  • শ্রেণিকক্ষে আলোচনা ও অনুসন্ধানভিত্তিক শেখা বাড়ানো

  • শিক্ষক প্রশিক্ষণে শিখন-মনোবিজ্ঞানের গুরুত্ব

  • অভিভাবকদের মধ্যে ফলের বাইরে শেখার মূল্যবোধ তৈরি

এগুলো ছাড়া শুধু নীতিমালায় পরিবর্তন এনে আনন্দ ফিরবে না।

শিক্ষা কি আনন্দ দিতে পারে?

উত্তর এক কথায়- হ্যাঁ, পারে।

কিন্তু তার জন্য আমাদের শিক্ষা দর্শনে একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার।

আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে-

আমরা কি এমন একটি শিক্ষা চাই, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু টিকে থাকে?

নাকি এমন শিক্ষা চাই, যেখানে সে শিখতে ভালোবাসে?

কারণ আনন্দহীন শিক্ষা হয়তো সার্টিফিকেট দেয়, কিন্তু আনন্দময় শিক্ষা মানুষ তৈরি করে।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com