গ্রাম–শহরের শিক্ষাবৈষম্য: গলদ কি অবকাঠামোয়, নাকি ভাবনায়?

প্রত্যন্ত অঞ্চল ও শহর এলাকার ফলাফল এবং সাফল্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যায়। আমরা কথা বলবো ঠিক কি কারণে- একই সিলেবাস, কিন্তু ভিন্ন ফল ?
গ্রাম–শহরের শিক্ষাবৈষম্য: গলদ কি  অবকাঠামোয়, নাকি ভাবনায়?
প্রকাশিত

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে দৃশ্যমান বাস্তবতা হলো, একই পাঠ্যক্রম, একই বই, একই পরীক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের অর্জনে স্পষ্ট পার্থক্য। দীর্ঘদিন ধরে এই বৈষম্যের জন্য দায়ী করা হয় অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে, শ্রেণিকক্ষের অভাব, প্রযুক্তির ঘাটতি, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংকট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অবকাঠামো উন্নয়ন সত্ত্বেও কেন এই ব্যবধান কমছে না?

সমস্যার মূল কি তাহলে আরও গভীরে, মানসিকতা ও শিক্ষাদর্শনে?

অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, ফল কেন বদলায়নি

গত এক দশকে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। আধুনিকায়নের সাথে তাল মিলিয়ে সারাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অবতাকাঠামোগত উন্নয়ন সাধনের ব্যাপক চেষ্টা চলছে। 

 নতুন ভবন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, বিনামূল্যের পাঠ্যবই, সবই বাস্তবতা। তবু শহরের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকছে। এর প্রধান কারণ হলো- সম বণ্টন ও সুষম বণ্টনের পার্থক্য আমলে না নেওয়া।

এ থেকে স্পষ্ট হয়, শিক্ষা কেবল দেয়াল, বেঞ্চ বা প্রযুক্তিনির্ভর বিষয় নয়। শিক্ষা মূলত একটি মানসিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া- যেখানে প্রত্যাশা, আত্মবিশ্বাস ও পরিবেশ বড় ভূমিকা রাখে।

প্রত্যাশার ব্যবধান: বড় সমস্যা, নীরব সংকট

শহরের শিক্ষার্থীদের প্রতি পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে বেশি ও সুস্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যারিয়ার, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, এসব বিষয়ে তারা ছোটবেলা থেকেই দিকনির্দেশনা পায়।

অন্যদিকে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনেক সময় সীমিত। ‘পাস করলেই হলো’, ‘কোনো একটা চাকরি পেলেই চলবে’, এই মানসিকতা শিক্ষার্থীর মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা গড়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে একই সিলেবাস পড়েও তাদের লক্ষ্য ও প্রস্তুতির গভীরতা এক থাকে না।

শিক্ষক–শিক্ষার্থী সম্পর্কের মানসিক ফারাক

গ্রাম ও শহরের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে একই হলেও পাঠদানের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য দেখা যায়। শহরের শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে ফলাফল, প্রতিযোগিতা ও দক্ষতা উন্নয়নে বেশি মনোযোগী হন।

গ্রামীণ বিদ্যালয়ে অনেক সময় পাঠদান সীমাবদ্ধ থাকে পাঠ্যবই শেষ করার মধ্যে। শিক্ষার্থীর প্রশ্ন, কৌতূহল বা ব্যক্তিগত সক্ষমতা বিকাশ সেখানে প্রাধান্য পায় না। এতে শিক্ষার্থী শেখে পরীক্ষায় টিকে থাকার কৌশল, চিন্তা করার দক্ষতা নয়।

আত্মবিশ্বাসের সংকট ও ‘আমি পারবো না’ মানসিকতা

গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি নীরব মানসিক বাধা কাজ করে, নিজেদের পিছিয়ে থাকার ধারণা। শহরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তুলনায় তারা নিজেদের কম সক্ষম ভাবতে শুরু করে।

এই আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি পরীক্ষার ফলাফল, ভর্তি পরীক্ষা বা উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে। অথচ যোগ্যতার বিচারে তারা অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নয়, পিছিয়ে থাকে সুযোগ ও মানসিক প্রস্তুতিতে।

সহায়ক পরিবেশের অসমতা

শহরের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিং, লাইব্রেরি, অনলাইন রিসোর্স, অভিভাবকের সহায়তা, এসব সুবিধা পায়। গ্রামীণ শিক্ষার্থীর জন্য এসব সুযোগ সীমিত।

কিন্তু এর চেয়েও বড় বিষয় হলো- শহরে পড়াশোনা একটি সামাজিক সংস্কৃতি, গ্রামে তা প্রায়ই ব্যক্তিগত লড়াই। পরিবার ও সমাজ শিক্ষাকে যতটা গুরুত্ব দেয়, ফলাফল ততটাই প্রভাবিত হয়।

একই সিলেবাস, ভিন্ন বাস্তবতা

জাতীয় পাঠ্যক্রম এক হলেও বাস্তব প্রয়োগ এক নয়। শহরে সিলেবাস মানে প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি, গ্রামে অনেক সময় তা কেবল পরীক্ষার সিলেবাস।

এই ব্যবধানের কারণে একই বই পড়েও শিক্ষার্থীদের শেখার গভীরতা ও প্রয়োগক্ষমতা ভিন্ন হয়ে যায়।

তাহলে সমাধান কোথায়?

গ্রাম–শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমাতে হলে কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন-

  • শিক্ষায় উচ্চ প্রত্যাশার সংস্কৃতি গড়ে তোলা

  • গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস তৈরি

  • শিক্ষকদের মানসিক ও দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রশিক্ষণ

  • অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবোধ তৈরি

শিক্ষাকে কেবল পাস–ফেলের হিসাব থেকে বের করে জীবন ও সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

উপসংহার

গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্যের মূল সমস্যা শুধু সুযোগের নয়, চিন্তার পার্থক্যের। একই সিলেবাসের ভিন্ন ফল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- শিক্ষা কেবল কাঠামো নয়, এটি মানসিক প্রস্তুতির বিষয়।

যেদিন গ্রাম ও শহরে শিক্ষাকে একই গুরুত্ব, একই স্বপ্ন ও একই প্রত্যাশার জায়গা থেকে দেখা হবে, সেদিনই এই বৈষম্য সত্যিকার অর্থে কমতে শুরু করবে।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com