

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ নেই। পাঠ্যবই বদলানো যায়, সিলেবাস সংস্কার করা যায়, প্রযুক্তি যোগ করা যায়, কিন্তু অনুপ্রাণিত শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো সংস্কারই টেকসই হয় না।
অথচ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আজ সবচেয়ে নীরব সংকটটি তৈরি হচ্ছে শিক্ষকদের ভেতর- একটি গভীর পেশাগত ক্লান্তি (Professional Burnout)।
এই ক্লান্তি হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি জমতে জমতে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে অনেক শিক্ষক আর নিজেকে “শিক্ষক” বলে গর্ব করতে পারেন না; বরং নিজেকে মনে করেন একটি অবমূল্যায়িত চাকরির যন্ত্রাংশ।
এক সময় শিক্ষকতা ছিল সামাজিক সম্মান, নৈতিক নেতৃত্ব ও জ্ঞানচর্চার প্রতীক।
আজ সেটি অনেকাংশেই নেমে এসেছে নিরাপত্তাহীন চাকরিতে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বহু শিক্ষক বছরের পর বছর অস্থায়ী, এমপিওভুক্ত না হওয়া অবস্থায় কাজ করছেন।
বেতন কাঠামো বাস্তব জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়
একই যোগ্যতায় অন্য পেশায় যে সম্মান ও সুযোগ, শিক্ষকতায় তা নেই
ফলে শিক্ষক নিজেই প্রশ্ন করেন-
“আমি কি সত্যিই সমাজে প্রয়োজনীয়?”
এই প্রশ্নের উত্তর না পেলে অনুপ্রেরণা টিকে থাকে না।
আজকের শিক্ষক শুধু ক্লাস নেন না।
তাঁকে হতে হয়-
ডাটা এন্ট্রি অপারেটর
অনলাইন রিপোর্ট প্রস্তুতকারী
প্রশিক্ষণ, সভা, জরিপের নিয়মিত অংশগ্রহণকারী
কখনো কখনো নির্বাচনী বা প্রশাসনিক কাজের লোকবল
শিক্ষাদান যেখানে হওয়া উচিত শিক্ষকের মূল কাজ, সেখানে বাস্তবে শিক্ষকের সময়ের বড় অংশ খেয়ে নিচ্ছে আমলাতান্ত্রিক কাজ।
ফলে ক্লাসরুমে শিক্ষক শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও, মানসিকভাবে অনুপস্থিত থাকেন।
বর্তমান ব্যবস্থায় ভালো শিক্ষক মানে-
যার ছাত্র বেশি জিপিএ-৫ পায়
যার প্রতিষ্ঠানের পাশের হার বেশি
যে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে পারেনি, তবু দায় নেয়
এখানে শিক্ষকের মানবিক ভূমিকা, চিন্তাশক্তি তৈরি, নৈতিক শিক্ষা, সব গৌণ।
এই ফলাফলকেন্দ্রিক সংস্কৃতি শিক্ষককে পরিণত করছ, চাপগ্রস্ত কোচিং ম্যানেজারে, শিক্ষাবিদে নয়।
শিক্ষার্থীর আচরণও বদলেছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
প্রযুক্তিনির্ভরতা বেড়েছে
মনোযোগ কমেছে
কর্তৃত্ব নয়, তর্ক: এটাই নতুন ভাষা
পরিবার অনেক সময় শিক্ষকের পাশে দাঁড়ায় না
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষক একা হয়ে পড়েন-
না পুরোপুরি কর্তৃত্বশীল, না পুরোপুরি সহযোগী।
এই ভূমিকাগত দ্বন্দ্ব শিক্ষককে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে।
বাংলাদেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণের সংখ্যা কম নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো-
এই প্রশিক্ষণগুলো কি শিক্ষকের মানসিক চাপ, পেশাগত হতাশা ও আত্মপরিচয়ের সংকট মোকাবিলা করে?
বাস্তবে-
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো কাঠামোগত সহায়তা নেই
কাউন্সেলিং বা সাপোর্ট সিস্টেম অনুপস্থিত
শিক্ষককে ‘ভেঙে পড়া মানুষ’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি নেই
শিক্ষককে আমরা সবসময় দাতা ভাবি, কিন্তু কখনো গ্রহীতা হিসেবে দেখি না।
শিক্ষকের অনুপ্রেরণা হারানো কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি জাতিগত ঝুঁকি।
এর প্রভাব পড়ে-
শ্রেণিকক্ষে নিস্প্রাণ পাঠদান
শিক্ষার্থীর সঙ্গে দূরত্ব
সৃজনশীলতা ও প্রশ্নচর্চার অবসান
শেষ পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হ্রাস
একজন ক্লান্ত শিক্ষক কখনোই অনুপ্রাণিত নাগরিক তৈরি করতে পারেন না।
সমাধান একক নয়, কিন্তু কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি-
▶️ শিক্ষককে আবার শিক্ষাবিদ হিসেবে ভাবা
প্রশাসনিক বোঝা কমিয়ে ক্লাসরুমে মনোযোগ ফেরানো
▶️ সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
ন্যায্য বেতন, স্থায়িত্ব ও পদোন্নতির স্বচ্ছ পথ
▶️ মানসিক সহায়তা কাঠামো
শিক্ষকদের জন্য কাউন্সেলিং ও পেশাগত সাপোর্ট
▶️ ফলাফল নয়, প্রক্রিয়াকে মূল্যায়ন
ভালো শিক্ষক মানে কেবল ভালো রেজাল্ট নয়
শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা যতই হোক, যদি শিক্ষককে কেবল বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখা হয়, নির্মাতা হিসেবে নয়। তাহলে অনুপ্রেরণা ফিরবে না।
শিক্ষক ক্লান্ত হলে শিক্ষা ক্লান্তিকর হয়।
আর শিক্ষা ক্লান্তিকর হলে জাতির ভবিষ্যৎ ক্রান্তিলগ্নে পড়ে।
প্রশ্ন তাই খুব সহ-
আমরা কি শিক্ষককে শুধু ব্যবহার করছি, নাকি মূল্য দিচ্ছি?