

একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনের পূর্বশর্ত হলো সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি। আর সেই সুনাগরিক গঠনের ভিত্তি তৈরি হয় পরিবার থেকে শুরু হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা নয়, বরং বাস্তবজীবনমুখী ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থাই একটি জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকলেও, তা থেকে বের হয়ে আসার দাবি বিভিন্ন মহল থেকে বারবার উঠেছে। তবে নানা কারণে এই কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। এ প্রেক্ষাপটে নতুন আশার বার্তা দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
বেসরকারি টেলিভিশন, ‘চ্যানেল আই’- এর জনপ্রিয় টকশো ‘ভিন্নমতে সহমত’- এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তবমুখী উপাদান যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যাচ্ছে না। তাঁর ১৭ বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লক্ষ্য করেছেন, দুর্বল ভিত্তি নিয়েই অধিকাংশ শিক্ষার্থী উচ্চস্তরে পৌঁছায়, যা পরবর্তীতে তাদের দক্ষতা ও সামগ্রিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম পাঁচ বছরে তিনটি মৌলিক বিষয়ের ওপর জোর দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। বিষয়গুলো হলো-কমিউনিকেশন (ভাষাগত দক্ষতা), সিভিক্স (নাগরিক সচেতনতা) এবং নিউমেরিক্স (গণিত দক্ষতা)।
তাঁর মতে, এই তিনটি ক্ষেত্র একটি শিশুর চিন্তাজগত ও সামাজিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে তোলে, যা পরবর্তীতে জীবনব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার জন্য অপরিহার্য।
এছাড়া, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সংহতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্কুল থেকেই কমিউনিটি বিল্ডিং শেখাতে হবে।নিজের মহল্লা, দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করতে হবে। সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন যে ‘আসাবিয়া’ বা সামাজিক সংহতির ধারণা দিয়েছেন, সেই চেতনা প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী শিক্ষা প্রদানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
যেমন- বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ইত্যাদি। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ও সামাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বছরে অন্তত একটি গাছ রোপণ করতে উৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি তারা স্কুল প্রাঙ্গণ ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার কাজেও অংশ নেবে। এর মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বগুণ এবং অংশগ্রহণমূলক মনোভাব তৈরি হবে, যা আধুনিক শিক্ষাবিদদের মতে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো, একজন শিক্ষার্থী যখন পঞ্চম শ্রেণি পাস করবে, তখন সে যেন শুধু একাডেমিকভাবে নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকেও একজন পূর্ণাঙ্গ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।