

সাহিত্য টিকে থাকে লেখকের কলমে, কিন্তু সাহিত্য বিকশিত হয় সমালোচনার ভেতর দিয়ে।
একটি সুস্থ সাহিত্যপরিবেশে সমালোচনা মানে কেবল প্রশংসা বা নিন্দা নয়,
সমালোচনা মানে হলো লেখার মান, দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে দায়িত্বশীল বিচার।
কিন্তু সমসাময়িক সাহিত্যচর্চায় আজ সবচেয়ে বড় যে সংকটটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো-
সৎ, নিরপেক্ষ ও সাহসী সমালোচনার অভাব।
সমালোচনা সাহিত্যকে আঘাত করে না; বরং সাহিত্যকে নিজের সীমা চিনতে সাহায্য করে।
একটি কার্যকর সমালোচনা-
লেখককে আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়
পাঠককে দিকনির্দেশনা দেয়
সাহিত্যিক মান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে
সমালোচনা ছাড়া সাহিত্যচর্চা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে আত্মতুষ্টির চর্চা।
আজ সাহিত্যাঙ্গনে সমালোচনার জায়গায় যা দেখা যায়, তা মূলত তিন ধরনের-
অন্ধ প্রশংসা
যেখানে লেখা ভালো হোক বা দুর্বল- সবই ‘অনন্য’, ‘অসাধারণ’।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণ
যেখানে লেখার বদলে লেখকই হয়ে ওঠেন আলোচনার বিষয়।
নীরবতা
যেখানে দুর্বল লেখা নিয়ে কেউ কিছু বলতেই চায় না।
এই তিনটির কোনোটিই সৎ মূল্যায়ন নয়।
সমসাময়িক সাহিত্যচর্চা অনেকাংশে ঘোরাফেরা করে-
পরিচিতি
বন্ধুত্ব
গোষ্ঠী ও নেটওয়ার্কের ভেতর
ফলে সমালোচনা মানে হয়ে দাঁড়ায় সম্পর্ক নষ্ট করার ঝুঁকি।
অনেকে ভাবেন, আজ আমি সমালোচনা করলে কাল আমার লেখার সমালোচনা হবে, বা আমাকে উপেক্ষা করা হবে।
এই ভয় সমালোচনাকে ভদ্র নীরবতায় রূপ দিয়েছে।
সাহিত্য পুরস্কার, প্রকাশনা সংস্থা ও উৎসবগুলো আজ সাহিত্যিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
সমালোচনার সংকটের একটি বড় কারণ হলো- এই ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে লেখক ও সমালোচকের সম্পর্ক।
যেখানে-
পুরস্কারের আশায় নীরবতা
প্রকাশনার আশায় আপস
আমন্ত্রণের আশায় প্রশংসা
সেখানে সৎ সমালোচনা জায়গা পায় না।
একসময় পাঠকই ছিল সাহিত্যের চূড়ান্ত বিচারক।
আজ সেই ভূমিকা অনেকটাই সংকুচিত।
কারণ-
পাঠকের মতামতকে ‘গুরুত্বহীন’ ভাবা হয়
জনপ্রিয়তাকে মানহীনতার সমার্থক ধরা হয়
ফলে সাহিত্যচর্চা পাঠক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে,
আর সমালোচনা সীমাবদ্ধ থাকে অল্প কয়েকজনের মধ্যে।
বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাহিত্যসমালোচনায় অনেক সময়-
তত্ত্ব থাকে
উদ্ধৃতি থাকে
কাঠামো থাকে
কিন্তু জীবনের স্পর্শ থাকে না।
অন্যদিকে সাধারণ পাঠকের পাঠে থাকে অনুভব, কিন্তু তার ভাষা বা পরিসর নেই।
এই দুইয়ের সংযোগ না হওয়াই সমালোচনার সংকটকে আরও গভীর করে।
সমালোচনার অভাবে-
দুর্বল লেখা বারবার পুনরুৎপাদিত হয়
লেখকের উন্নতির সুযোগ কমে
সাহিত্যমান স্থবির হয়ে পড়ে
সবচেয়ে বড় কথা, ভালো ও মাঝারি লেখার পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়।
সাহিত্য তখন মানের নয়, পরিচয়ের প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে।
সৎ সমালোচনার জন্য প্রয়োজন-
ব্যক্তিকে নয়, লেখাকে কেন্দ্র করা
যুক্তি ও উদাহরণভিত্তিক বিশ্লেষণ
লেখকের প্রতি সম্মান রেখে মতভেদ
সমালোচনা মানে শত্রুতা নয়,
বরং সাহিত্যকে গুরুত্ব দিয়ে নেওয়ার প্রমাণ।
সমালোচনার অনুপস্থিতিতে সাহিত্য হয়তো টিকে থাকে,
কিন্তু সে আর এগোয় না।
আজ প্রয়োজন এমন এক সাহিত্যপরিবেশ, যেখানে প্রশংসা থাকবে, কিন্তু প্রশ্নও থাকবে;
যেখানে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু দায়বদ্ধতাও থাকবে।
কারণ সৎ সমালোচনা কোনো সাহিত্যকে দুর্বল করে না- বরং তাকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দেয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই লেখক বা সমালোচকের নয়,
আমরা কি এমন সাহিত্য চাই, যা সত্যিকার অর্থে বিকশিত হোক?