

শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কথা শিক্ষার্থীর। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষা নীতি, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি কিংবা শ্রেণিকক্ষ সংস্কারে শিক্ষার্থীর কণ্ঠ প্রায় অনুপস্থিত। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাদের জন্য, কিন্তু তাদের সঙ্গে নয়।
প্রশ্ন তাই শুধু নীতিগত নয়, নৈতিকও।
শিক্ষা ব্যবস্থায় যাদের জীবন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়, তাদের মতামত কেন উপেক্ষিত থাকে?
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে উপনিবেশিক কাঠামোর ওপর। এই কাঠামোয় শিক্ষার্থীকে দেখা হয়েছে ‘গ্রহণকারী’ হিসেবে, অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়।
শিক্ষক ও প্রশাসন জানে কী পড়াতে হবে, শিক্ষার্থী শুধু মানিয়ে নেবে, এই ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
এই উত্তরাধিকার আজও বহাল।
নীতি প্রণয়ন থেকে শ্রেণিকক্ষ, সব জায়গায় সিদ্ধান্ত আসে ওপর থেকে নিচে।
জাতীয় শিক্ষা নীতি, পাঠ্যক্রম সংস্কার বা পরীক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন, এই সব সিদ্ধান্তে থাকে আমলা, শিক্ষাবিদ, প্রশাসক ও রাজনীতিকদের কণ্ঠ। কিন্তু শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকে না বললেই চলে।
ফলে যে সমস্যা তৈরি হয়-
নীতিতে বাস্তব শিক্ষার্থী অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকে না
শ্রেণিকক্ষের চাপ, পরীক্ষা ভীতি বা মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থাকে
সংস্কার বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গড়ে ওঠে না
নীতির ভাষা থাকে সুন্দর, কিন্তু মাঠে তার কার্যকারিতা সীমিত হয়।
শিক্ষার্থীর কণ্ঠ দমে যাওয়ার শুরুটা হয় শ্রেণিকক্ষেই।
“প্রশ্ন করা মানে ‘বাড়াবাড়ি’, ভিন্নমত মানে ‘অশোভন’”, এই সংস্কৃতিতে শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে চুপ থাকতে শেখে।
ফলে-
মত প্রকাশের দক্ষতা গড়ে ওঠে না
আত্মবিশ্বাস কমে
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্ভরশীলতা বাড়ে
শিক্ষা যেখানে নাগরিক গঠনের জায়গা, সেখানে নীরব নাগরিক তৈরি হওয়া বড় বিপর্যয়।
অনেকেই বলেন, শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ মানেই শিক্ষার্থী রাজনীতি। এই ভুল সমীকরণের কারণে শিক্ষার্থীর কণ্ঠকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। অথচ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ মানে-
নীতি আলোচনায় মতামত দেওয়া
শ্রেণিকক্ষ ও ক্যাম্পাস সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া
শিক্ষার মানোন্নয়নে সহযোগী হওয়া
রাজনীতি আর অংশগ্রহণ এক নয়। এই বিভ্রান্তিই শিক্ষার্থীর কণ্ঠকে আরও সংকুচিত করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু তা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হচ্ছে না। অভিযোগ, দাবি বা পরামর্শ অনেক সময় প্রশাসনিক নথির বাইরেই থেকে যায়।
এতে শিক্ষার্থীর মধ্যে জন্ম নেয় এক ধরনের হতাশা, বললেও শোনা হবে না।
শিক্ষার্থীর কণ্ঠ মানে শুধু মতামত নয়, এটি নীতির মান উন্নয়নের একটি হাতিয়ার। শিক্ষার্থী জানে-
কোন পাঠ্য বিষয় বোঝা কঠিন
কোন মূল্যায়ন পদ্ধতি অযৌক্তিক চাপ তৈরি করছে
কোন পরিবর্তন বাস্তবে কার্যকর হবে
এই জ্ঞান ছাড়া শিক্ষা নীতি অর্ধেক অন্ধ।
সমাধান আছে, যদি সদিচ্ছা থাকে-
শিক্ষা নীতি প্রণয়নে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি
বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর শিক্ষার্থী ফোরাম
শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন ও মত প্রকাশকে উৎসাহ প্রদানে যথাযথ উদ্যোগ
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী ফিডব্যাক বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করা
সর্বোপরি, শিক্ষার্থী অংশগ্রহণকে নিরাপত্তা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখা
শিক্ষা শুধু পাঠ্যসূচি নয়, এটি নাগরিকত্বের প্রস্তুতি।
শিক্ষার্থীর কণ্ঠ উপেক্ষা করে গড়া শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ কর্মী তৈরি করলেও সচেতন নাগরিক তৈরি করতে পারে না।
প্রশ্ন তাই একটাই-
যদি শিক্ষার্থীর কথা শোনা না হয়, তবে এই শিক্ষা আসলে কার জন্য?
এই প্রশ্নের মুখোমুখি না হলে শিক্ষা সংস্কার কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।