

দীর্ঘদিন ধরে সিনেমা শিল্প দাঁড়িয়ে ছিল তারকাকেন্দ্রিক এক মডেলের ওপর। বড় তারকা মানেই বড় বাজেট, নিশ্চিত দর্শক এবং বক্স অফিস সাফল্যের সম্ভাবনা। কিন্তু সময় বদলেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, দর্শকের রুচির পরিবর্তন এবং গল্পনির্ভর কনটেন্টের চাহিদা এই কাঠামোকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।
আজ প্রশ্ন উঠছে, স্টারডম কি সত্যিই তার প্রভাব হারাচ্ছে, নাকি তার সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে?
স্টারডম কখনোই কেবল অভিনয়ের দক্ষতা নয়; এটি ছিল এক সামাজিক নির্মাণ। পোস্টার, পত্রিকা, ফ্যান ক্লাব ও মিডিয়ার প্রচারে তারকারা হয়ে উঠতেন বৃহত্তর কল্পনার অংশ। দর্শক সিনেমা দেখতে যেতেন প্রিয় তারকার জন্য, গল্প বা নির্মাণ তখন দ্বিতীয় বিবেচনা। এই মডেল দীর্ঘদিন কার্যকর ছিল, বিশেষ করে প্রেক্ষাগৃহনির্ভর যুগে।
ওটিটি ও অন-ডিমান্ড কনটেন্ট দর্শকের হাতে তুলে দিয়েছে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা। এখন আর দর্শক নির্দিষ্ট তারকার সিনেমা দেখতেই বাধ্য নয়। একটি ভালো গল্প, শক্ত চিত্রনাট্য বা ভিন্নধর্মী নির্মাণই দর্শককে টেনে নিচ্ছে। এতে তারকার নামের চেয়ে কনটেন্টের মানই হয়ে উঠছে প্রধান বিবেচ্য।
বর্তমান দর্শক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, বাস্তবধর্মী ও চরিত্রনির্ভর গল্পে বেশি আগ্রহী। সামাজিক সংকট, সম্পর্কের জটিলতা, মানসিক স্বাস্থ্য বা প্রান্তিক জীবনের গল্প, এসব কনটেন্ট তারকাবিহীন হলেও জনপ্রিয় হচ্ছে। এই প্রবণতা প্রমাণ করে, শক্ত গল্প থাকলে তারকা ছাড়াও সিনেমা দর্শক খুঁজে পায়।
স্টারডম পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি; বরং রূপান্তরিত হয়েছে। আজকের তারকাকে কেবল গ্ল্যামার নয়, অভিনয়ের দক্ষতা ও চরিত্র নির্বাচনের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হচ্ছে। তারকারা এখন নিজেরাই কনটেন্টের অংশ, একমাত্র বিক্রয়পয়েন্ট নন।
বড় তারকা মানেই বড় পারিশ্রমিক ও বাজেট। কনটেন্ট-নির্ভর সিনেমা তুলনামূলকভাবে কম বাজেটে নির্মিত হলেও ভালো মুনাফা দিতে পারে। প্রযোজকের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিরাপদ বিনিয়োগ। ফলে তারকাকেন্দ্রিক ঝুঁকির বদলে গল্পনির্ভর প্রকল্পে ঝোঁক বাড়ছে।
বিশ্বজুড়ে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ওটিটি সিরিজ বা স্বাধীন সিনেমায় অজানা মুখও বিশ্বখ্যাত হয়ে উঠছে কনটেন্টের জোরে।
এতে প্রমাণ হচ্ছে, ভাষা বা তারকা নয়, গল্পই আন্তর্জাতিক দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও রিভিউ সংস্কৃতি তারকাকেন্দ্রিক প্রচারের প্রভাব কমিয়েছে। দর্শক এখন মতামত জানাচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে। দুর্বল কনটেন্ট তারকা থাকলেও দ্রুত মুখ থুবড়ে পড়ছে, আবার ভালো কনটেন্ট মুখে-মুখে ছড়িয়ে সাফল্য পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিনেমার ভবিষ্যৎ কোনো একক মডেলে নয়। স্টারডম ও কনটেন্ট, দুটোই সহাবস্থানে থাকবে। তবে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলেছে। তারকা থাকলে সুবিধা আছে, কিন্তু একমাত্র ভরসা হিসেবে আর যথেষ্ট নয়।
স্টারডমের অবসান, এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না। বাস্তবে অবসান হয়নি, বরং তারকাকেন্দ্রিক আধিপত্যের যুগ শেষ হচ্ছে। কনটেন্ট-নির্ভর সিনেমার উত্থান দর্শককে কেন্দ্রে এনে দিয়েছে, যেখানে গল্পই শেষ কথা। এই পরিবর্তন সিনেমা শিল্পের জন্য সংকট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার ইঙ্গিত।