

এক সময় সংগীত শিল্পের কেন্দ্র ছিল ক্যাসেট, সিডি আর অ্যালবাম বিক্রি। গান প্রকাশ মানেই ছিল নির্দিষ্ট প্রযোজনা সংস্থা, সীমিত শিল্পী ও নিয়ন্ত্রিত বাজার। কিন্তু ডিজিটাল বিপ্লব সেই কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। আজ ইউটিউব, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিকসহ নানা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে গানই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে সহজলভ্য বিনোদন। এই পরিবর্তন সংগীতকে যেমন গণমুখী করেছে, তেমনি শিল্পীদের সামনে তৈরি করেছে আয় ও টিকে থাকার এক জটিল বাস্তবতা।
ইউটিউব ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম সংগীতকে করেছে গণতান্ত্রিক। এখন যে কেউ গান তৈরি করে বিশ্বদর্শকের সামনে তুলে ধরতে পারে। এতে নতুন শিল্পীর জন্য প্রবেশের বাধা কমেছে। কিন্তু এই সহজলভ্যতাই আবার বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন হাজারো গান প্রকাশিত হওয়ায় শ্রোতার মনোযোগ পাওয়া হয়ে উঠেছে সবচেয়ে কঠিন কাজ। প্রতিভার পাশাপাশি এখন প্রয়োজন দৃশ্যমানতা, ব্র্যান্ডিং ও ডিজিটাল কৌশল।
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে আয়ের হিসাব শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবতা অনেক কঠিন। একটি গান লক্ষ বা কোটি বার স্ট্রিম হলেও শিল্পীর হাতে যে অর্থ পৌঁছায়, তা তুলনামূলকভাবে কম। প্ল্যাটফর্ম, ডিস্ট্রিবিউটর, প্রযোজক, সব স্তর পেরিয়ে শিল্পীর প্রাপ্য অংশ ক্ষুদ্র হয়ে যায়। ফলে অনেক শিল্পীর জন্য স্ট্রিমিং আয় একমাত্র জীবিকা হয়ে উঠতে পারে না।
ইউটিউব শিল্পীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রচারের মাধ্যম। ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের কারণে গান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে এখানেও বিজ্ঞাপননির্ভর আয়ের মডেল অনিশ্চিত। ভিউ বাড়লেও বিজ্ঞাপনের ধরন, অঞ্চলভিত্তিক রেট ও অ্যালগরিদমের ওপর আয় নির্ভর করে। ফলে শিল্পীরা জনপ্রিয় হলেও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
স্ট্রিমিং যুগে অ্যালগরিদমই অনেকাংশে ঠিক করে দেয় কে শোনা হবে, কে হারিয়ে যাবে। প্লেলিস্টে জায়গা পাওয়া মানেই শ্রোতার কাছে পৌঁছানো। কিন্তু এই প্রক্রিয়া সবসময় স্বচ্ছ নয়। অনেক প্রতিভাবান শিল্পী অ্যালগরিদমের বাইরে পড়ে যান, আবার ট্রেন্ডভিত্তিক গান দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পমান ও তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
টিকটক, শর্টস ও রিলস সংস্কৃতি গানের দৈর্ঘ্য ও গঠনে প্রভাব ফেলছে। এখন অনেক গান তৈরি হচ্ছে ভাইরাল হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে- সংক্ষিপ্ত, পুনরাবৃত্তিমূলক ও ট্রেন্ডনির্ভর। এতে সাময়িক জনপ্রিয়তা এলেও দীর্ঘস্থায়ী শিল্পমূল্য প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সীমিত আয়ের কারণে শিল্পীরা আবার লাইভ শো, কনসার্ট, ব্র্যান্ড সহযোগিতা ও মার্চেন্ডাইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। স্ট্রিমিং এখানে একটি প্রচারমাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। যার মাধ্যমে শিল্পী শ্রোতা তৈরি করে, আর্থিক আয় আসে অন্য খাত থেকে। অর্থাৎ গান শোনা বিনামূল্যে, কিন্তু অভিজ্ঞতা বিক্রি হচ্ছে।
আজকের সংগীতশিল্পী শুধু গায়ক বা সুরকার নন; তাকে হতে হচ্ছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, মার্কেটার ও উদ্যোক্তা। সোশ্যাল মিডিয়া উপস্থিতি, দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলা এখন টিকে থাকার শর্ত। এই বহুমাত্রিক ভূমিকা অনেক শিল্পীর জন্য মানসিক চাপও তৈরি করছে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের শিল্পীদের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও গভীর। স্থানীয় বিজ্ঞাপন বাজার ছোট, স্ট্রিমিং রেট কম এবং কপিরাইট সচেতনতা সীমিত। ফলে অনেক শিল্পী যথাযথ রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত হন। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সংগীত শিল্পের ভবিষ্যৎ একক কোনো আয়ের উৎসে নয়, বরং বহুমুখী মডেলে। স্ট্রিমিং, লাইভ পারফরম্যান্স, ব্র্যান্ডিং, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সব মিলিয়েই শিল্পীদের টিকে থাকতে হবে। একই সঙ্গে ন্যায্য রয়্যালটি, স্বচ্ছ অ্যালগরিদম ও কপিরাইট সংস্কার ছাড়া এই লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
ইউটিউব ও স্ট্রিমিং যুগ সংগীতকে দিয়েছে সীমাহীন শ্রোতা, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আর্থিক নিশ্চয়তা। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই শিল্পীরা লড়ছেন, সৃজনশীলতা ধরে রেখে টিকে থাকার জন্য। সংগীত আজ আর শুধু শিল্প নয়, এটি একটি কঠিন পেশা। এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রযুক্তি, নীতিমালা ও শিল্পীদের সম্মিলিত সচেতনতার ওপর।