নারী প্রবাসী শ্রমিকের অবস্থান: সুরক্ষা নাকি শুধু কাগুজে নীতি?

নারী প্রবাসী শ্রমিকের অবস্থান: সুরক্ষা নাকি শুধু কাগুজে নীতি?
প্রকাশিত

প্রবাসী শ্রমিক বললেই আমাদের চোখে ভাসে নির্মাণকর্মী বা কারখানার শ্রমিকের ছবি। কিন্তু নীরবে, ঘরের ভেতরে, চার দেয়ালের আড়ালে কাজ করা নারী প্রবাসী শ্রমিকরা, বিশেষ করে গৃহকর্মীরা আজ প্রবাস ব্যবস্থার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অথচ সবচেয়ে অবহেলিত অংশ।

রাষ্ট্রীয় নীতিতে তাদের জন্য আছে “সুরক্ষা”, “বিশেষ নজর” ও “জিরো টলারেন্স”। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় প্রশ্নটা আরও কঠিন হয়ে ওঠে:

এই সুরক্ষা কি সত্যিই কার্যকর, নাকি কেবল কাগুজে আশ্বাস?

নারী প্রবাসী শ্রমিক: সংখ্যার বাইরে থাকা বাস্তবতা

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার নারী মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে গৃহকর্মী হিসেবে পাড়ি জমান। তারা যান-

  • অর্থনৈতিক সংকটে

  • পরিবারের দায় কাঁধে নিয়ে

  • বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে

কিন্তু যাওয়ার পরই তারা ঢুকে পড়েন এমন এক কর্মপরিবেশে, যেখানে শ্রম আইন সবচেয়ে দুর্বল, আর নজরদারি প্রায় শূন্য।

গৃহকর্ম: শ্রমের স্বীকৃতি নেই

বেশিরভাগ গন্তব্য দেশে গৃহকর্মকে পূর্ণাঙ্গ শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। ফলে-

  • নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই

  • ছুটি পাওয়ার অধিকার অস্পষ্ট

  • কাজের পরিধি সীমাহীন

একজন নারী শ্রমিক গৃহকর্মী হিসেবে যান, কিন্তু বাস্তবে তাকে রান্না, পরিষ্কার, শিশুসেবা, বৃদ্ধ পরিচর্যা, সব একসঙ্গে করতে হয়, কোনো অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ছাড়াই।

হ্যারাসমেন্ট: সবচেয়ে নীরব সংকট

নারী প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর সমস্যা হলো-

  • শারীরিক নির্যাতন

  • মানসিক নির্যাতন

  • যৌন হয়রানি

কিন্তু এই নির্যাতনের বেশিরভাগ ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। কারণ-

  • অভিযোগ করলে কাজ হারানোর ভয়

  • ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা

  • পুলিশ বা আদালতের ওপর অনাস্থা

  • দেশে ফেরত পাঠানোর হুমকি

ফলে নির্যাতন ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে চাপা পড়ে যায়।

অভিযোগ প্রক্রিয়া: কেন এত জটিল?

নীতিমালায় অভিযোগের পথ থাকলেও বাস্তবে সেটি নারীদের জন্য প্রায় অচল। কারণ-

  • অভিযোগ করতে হলে নিয়োগকর্তার অনুমতি দরকার পড়ে

  • শেল্টার হোমে গেলে দীর্ঘদিন আটকে থাকার শঙ্কা

  • মামলা মানেই ভিসা অনিশ্চিত

  • অনেক দূতাবাসে নারী-কেন্দ্রিক আইনি সহায়তা সীমিত

ফলে অভিযোগ করা মানে নতুন এক অনিশ্চয়তায় পা দেওয়া।

কফিল নির্ভরতা: ক্ষমতার অসম সম্পর্ক

গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে কফিল বা নিয়োগকর্তাই হয়ে ওঠেন-

  • কাজের মালিক

  • থাকার জায়গার মালিক

  • কখনো কখনো পাসপোর্টের নিয়ন্ত্রক

এই অসম ক্ষমতার সম্পর্কেই জন্ম নেয় নির্যাতন, এবং সেখানেই আটকে যায় প্রতিকার।

রাষ্ট্রীয় নীতি: শক্ত ভাষা, দুর্বল প্রয়োগ

বাংলাদেশ সরকার নারী প্রবাসীদের সুরক্ষায় নানা নীতি গ্রহণ করেছে-

  • বয়সসীমা নির্ধারণ

  • প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক

  • দ্বিপাক্ষিক চুক্তি

কিন্তু বাস্তবে-

  • রিক্রুটিং পর্যায়ে তদারকি দুর্বল

  • গন্তব্য দেশে মনিটরিং সীমিত

  • দূতাবাসের জনবল অপ্রতুল

ফলে নীতির শক্ত ভাষা মাঠে এসে নরম হয়ে যায়।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বনাম বাস্তবতা

আইএলওর ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স কনভেনশন (C189) অনুযায়ী-

  • গৃহকর্মীর পূর্ণ শ্রম অধিকার থাকা উচিত

  • নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা থাকা দরকার

কিন্তু অনেক গন্তব্য দেশ এই কনভেনশন বাস্তবায়নে অনাগ্রহী, আর প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চাপও সীমিত।

কেন নারী প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

কারণ-

  • কাজের জায়গা ব্যক্তিগত ঘর

  • নজরদারির সুযোগ নেই

  • সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য

  • আইনি সহায়তার পথ সংকীর্ণ

এই সব মিলিয়ে নারী প্রবাসীরা হয়ে পড়েন প্রবাস ব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল কড়ি।

সমাধানের পথে কী করা দরকার?

একজন অভিবাসন ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপারিশ-

  • গৃহকর্মকে পূর্ণাঙ্গ শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে কূটনৈতিক চাপ

  • অভিযোগকারীদের জন্য ভিসা ও কাজ সুরক্ষা

  • দূতাবাসে নারী-আইন সেল শক্তিশালী করা

  • রিক্রুটিং পর্যায়ে জিরো টলারেন্স বাস্তবায়ন

  • নারী প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে যুক্ত করা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- নারী প্রবাসীদের সহানুভূতির বিষয় নয়, অধিকারধারী নাগরিক হিসেবে দেখা।

শেষ কথা

নারী প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা যদি কেবল কাগজে থাকে, তাহলে তা সুরক্ষা নয়, প্রতারণা। একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা যাচাই হয় সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের নিরাপত্তা দিয়ে।

প্রবাসনীতি তখনই ন্যায়ভিত্তিক হবে,

যখন কোনো নারী প্রবাসীকে আর বলতে না হয়-

“অভিযোগ করলে আমার জীবনই অনিশ্চিত হয়ে যাবে।”

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com