

কাগজে-কলমে প্রবাসী শ্রমিকের অধিকার আছে। শ্রম আইন আছে, আদালত আছে, অভিযোগ ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু বাস্তবে যখন একজন প্রবাসী শ্রমিক বেতন না পাওয়া, চুক্তিভঙ্গ বা নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে শ্রম আদালতের দরজায় পৌঁছান, তখন তিনি আবিষ্কার করেন এক নির্মম সত্য:
অধিকার কাগজে আছে, কিন্তু আদালতে পৌঁছানোর পথ নেই।
এই বাস্তবতাই প্রবাসী শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় আইনি বৈপরীত্য।
বেশিরভাগ শ্রমগন্তব্য দেশে শ্রম আদালত মূলত স্থানীয় নাগরিকদের জন্য কার্যকর। অভিবাসী শ্রমিকরা সেখানে আইনত “অধিকারধারী” হলেও বাস্তবে তারা-
ভাষাগতভাবে অক্ষম
আইনি প্রক্রিয়ায় অপরিচিত
সময় ও অর্থে সীমাবদ্ধ
ফলে আদালত হয়ে ওঠে অধিকার আদায়ের জায়গা নয়, বরং এক ধরনের অপ্রবেশযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
শ্রম আদালতে মামলা করতে হলে দরকার-
লিখিত অভিযোগ
প্রমাণপত্র
স্থানীয় ভাষায় আবেদন
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হাজিরা
একজন প্রবাসী শ্রমিকের জন্য এটি প্রায় অসম্ভব। কারণ-
অধিকাংশ চুক্তি তার নিজের কাছেই নেই
কাজের সময় বা বেতন সংক্রান্ত কোনো লিখিত রেকর্ড থাকে না
অভিযোগ লিখতে স্থানীয় ভাষায় দক্ষতা নেই
ফলে মামলা শুরুর আগেই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।
শ্রম আদালতের ভাষা স্থানীয়। আইনজীবী, বিচারক, নথিপত্র, সবকিছুই সেই ভাষায়।
প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে-
দোভাষী পাওয়া কঠিন
দোভাষীর খরচ শ্রমিককেই বহন করতে হয়
ভুল অনুবাদে মামলার ক্ষতি হয়
ভাষা এখানে শুধু যোগাযোগের সমস্যা নয়; এটি ন্যায়বিচারের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার অদৃশ্য চাবি।
আইন বলছে শ্রম আদালত সাশ্রয়ী। বাস্তবে খরচের তালিকা দীর্ঘ-
মামলা ফাইলিং ফি
আইনজীবীর পারিশ্রমিক
অনুবাদ ও নথি খরচ
শুনানির দিন কাজ না করার ক্ষতি
একজন প্রবাসী শ্রমিক, যিনি ইতোমধ্যে বেতন না পেয়ে বিপদে, তার পক্ষে এই খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব।
শ্রম আদালতে মামলা মানে সময়।
মাসের পর মাস শুনানি
এক তারিখে হাজিরা না দিলে মামলা খারিজ
মামলা চলাকালে কাজের অনুমতি অনিশ্চিত
এই সময়ে প্রবাসী শ্রমিক-
আয়হীন হয়ে পড়েন
ভিসা নবায়নের ঝুঁকিতে পড়েন
অনেক ক্ষেত্রে দেশে ফেরত পাঠানো হয়
ফলে ন্যায়বিচার পাওয়ার আগেই মামলাটি অর্থহীন হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো-
মামলা করা মানেই ভিসা ঝুঁকিতে ফেলা।
অনেক দেশে,
মামলা চলাকালে কাজ বদল নিষিদ্ধ
নিয়োগকর্তা ভিসা বাতিল করতে পারে
মামলা শেষে ফেরত পাঠানোর নজির আছে
এই বাস্তবতায় শ্রমিক প্রশ্ন করেন-
“ন্যায় চাইব, না বৈধতা বাঁচাব?”
দূতাবাস শ্রম আদালতে সরাসরি মামলা লড়ে না। তারা সাধারণত-
পরামর্শ দেয়
মধ্যস্থতা করে
প্রয়োজনে শেল্টার দেয়
কিন্তু আইনি লড়াইয়ের পুরো বোঝা পড়ে শ্রমিকের ওপর। জনবল, বাজেট ও কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতায় দূতাবাসের ভূমিকা অনেক সময় প্রতীকী হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কারণগুলো কাঠামোগত-
অভিবাসী শ্রমিকরা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল
শ্রম আইন প্রয়োগে রাষ্ট্রীয় আগ্রহ সীমিত
নিয়োগকর্তা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রাধান্য পায়
ফলে শ্রম আদালত শক্তিশালীদের জন্য কার্যকর, দুর্বলদের জন্য নয়।
আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী-
অভিবাসী শ্রমিকের সমান আইনি অধিকার থাকতে হবে
ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে
কিন্তু এসব কনভেনশন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন-
রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা
কূটনৈতিক চাপ
কার্যকর মনিটরিং
যা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
একজন অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপারিশ-
শ্রম আদালতে প্রবাসীদের জন্য ফ্রি লিগ্যাল এইড
দোভাষী ও আইনি সহায়তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা
মামলা চলাকালে ভিসা ও কাজের সুরক্ষা
দূতাবাসে শক্তিশালী শ্রম-আইন ইউনিট
অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিষিদ্ধ
সবচেয়ে জরুরি, শ্রম আদালতকে বাস্তব অর্থে শ্রমিকবান্ধব করা।
প্রবাসীরা আইন ভাঙে না; তারা আইনের দরজায় দাঁড়িয়ে ঢুকতে পারে না। কাগজে অধিকার থাকা মানেই ন্যায়বিচার পাওয়া নয়, ন্যায়বিচারের পথও খোলা থাকতে হয়।
একটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার চর্চা তখনই বিশ্বাসযোগ্য,
যখন সবচেয়ে দুর্বল শ্রমিকও আদালতের দরজায় দাঁড়িয়ে বলতে পারে-
“আমি একা নই।”