প্রবাস থেকে ফেরা:কেন অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসীদের জীবন অনিরাপদ হয়ে ওঠে?

বাংলাদেশে অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসী মানে পুনর্বাসনের ফাঁক, নিঃশেষ সঞ্চয় আর সমাজের নীরব চাপ, উত্তরণে পদক্ষেপ জরুরি
প্রবাস থেকে ফেরা:কেন অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসীদের জীবন অনিরাপদ হয়ে ওঠে?
প্রকাশিত

বিদেশে কাটানো তিন দশক। নির্মাণ সাইট, ফ্যাক্টরি বা গৃহস্থালি কাজে দিনের পর দিন পরিশ্রম। রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা, জমি কেনা, সংসারের স্বপ্ন, সবই গড়া হয়েছে প্রবাসী আয়ের ওপর। কিন্তু যখন বয়স বাড়ে, শরীর আর সায় দেয় না, কিংবা চুক্তি শেষ হয়ে যায়, তখন দেশে ফেরা আর উৎসব থাকে না। শুরু হয় জীবনের দ্বিতীয়, আরও কঠিন ধাক্কা।

বাংলাদেশে অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসী মানে কেবল কাজ শেষ করা মানুষ নয়; তারা একদল মানুষ, যারা রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রেখে শেষ বয়সে এসে নিজেরাই পড়ে যান সবচেয়ে অনিরাপদ অবস্থানে।

প্রবাস-পরবর্তী বাস্তবতা: যে শূন্যতা কেউ দেখে না

বিদেশে কাজ করার সময় একজন শ্রমিকের পরিচয় ছিল স্পষ্ট, তিনি উপার্জনক্ষম। দেশে ফেরার পর সেই পরিচয় হঠাৎ করেই ঝাপসা হয়ে যায়। নিয়মিত আয় নেই, নতুন করে কাজের বাজারে প্রবেশের বয়সও নেই। অনেক ক্ষেত্রে-

  • সঞ্চয় ভেঙে গেছে চিকিৎসা ও পারিবারিক ব্যয়ে

  • কোনো পেনশন বা অবসর ভাতা নেই

  • বিদেশে অর্জিত দক্ষতার দেশে স্বীকৃতি নেই

ফলে দেশে ফেরার কয়েক বছরের মধ্যেই শুরু হয় আর্থিক অবনমন।

পুনর্বাসন কেন বারবার ব্যর্থ হয়?

রাষ্ট্রীয়ভাবে “পুনর্বাসন” শব্দটি বহু নথিতে থাকলেও বাস্তবে এটি সবচেয়ে দুর্বল অংশ। ফেরত প্রবাসীদের জন্য যেসব উদ্যোগের কথা বলা হয়- ঋণ, প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা, সেগুলো প্রায়শই পৌঁছায় না প্রকৃত ভুক্তভোগীদের কাছে।

কারণগুলো স্পষ্ট-

  • বয়সজনিত কারণে ব্যাংক ঋণে অযোগ্যতা

  • ব্যবসা পরিচালনার প্রশিক্ষণের অভাব

  • সরকারি দপ্তরের ডেমোক্রেটিক জটিলতা

  • “তুমি তো বিদেশে ছিলে, তোমার আবার সাহায্য কেন”- এই সামাজিক মনোভাব

ফলে পুনর্বাসন কাগজে থাকে, জীবনে নয়।

সঞ্চয়: কাগজে হিসাব, বাস্তবে শূন্য

প্রবাসী জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় পরিকল্পনার অভাব। বেশিরভাগ প্রবাসীই আয়ের বড় অংশ পাঠান দেশে, কিন্তু সেই অর্থ-

  • প্রোডাকটিভ বিনিয়োগে যায় না

  • আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে

  • জমি বা ঘর হয়, কিন্তু আয় সৃষ্টি করে না

ফলে দেশে ফেরার পর দেখা যায়, সম্পদ আছে, কিন্তু নগদ প্রবাহ নেই। চিকিৎসা, নিত্যখরচ, সন্তানের দায়িত্ব, সব মিলিয়ে সঞ্চয় দ্রুত নিঃশেষ হয়।

মানসিক ধাক্কা: সবচেয়ে উপেক্ষিত বাস্তবতা

অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। বিদেশে তারা ছিলেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, দেশে ফিরে হন কর্মহীন ও গুরুত্বহীন।

ফলাফল-

  • আত্মসম্মানবোধের ভাঙন

  • হতাশা ও বিষণ্নতা

  • পরিবারে সিদ্ধান্তহীনতা

  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

অনেকে প্রকাশ্যে বলেন না, কিন্তু বাস্তবে তারা অনুভব করেন, নিজের ঘরেই তারা অতিরিক্ত মানুষ।

পারিবারিক ও সামাজিক চাপ

দেশে ফেরার পর পরিবারও বদলে যায়। সন্তানরা বড় হয়েছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নিজের মতো। যে প্রবাসী একসময় পরিবারের মূল ভরকেন্দ্র ছিলেন, তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন নির্ভরশীল।

গ্রামে বা সমাজে আবার শুরু হয় অন্য চাপ-

  • “বিদেশে ছিলে, এখনো কেন কষ্ট?”

  • আত্মীয়দের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা

  • সামাজিক অনুষ্ঠানে আর্থিক অংশগ্রহণের চাপ

এই চাপ অনেক সময় প্রবাসীকে বাধ্য করে নিজের প্রয়োজন উপেক্ষা করতে।

রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসী: অদৃশ্য জনগোষ্ঠী

নীতিনির্ধারণে অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসীরা কার্যত অনুপস্থিত। রেমিট্যান্স আসা পর্যন্ত তারা গুরুত্বপূর্ণ, ফেরার পর তারা পরিসংখ্যানের বাইরে।

এখনো নেই-

  • প্রবাসী পেনশন ব্যবস্থা

  • বাধ্যতামূলক সঞ্চয় স্কিম

  • ফেরত প্রবাসীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নেট

  • মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কাঠামো

ফলে তারা পড়ে যান রাষ্ট্র ও বাজার, দুটোরই মাঝখানে।

কেন এই দ্বিতীয় ধাক্কা সবচেয়ে ভয়াবহ

কারণ এই ধাক্কার সময়-

  • বয়স কাজ করার পক্ষে নয়

  • শক্তি লড়াই করার মতো নেই

  • সামাজিক সাপোর্ট দুর্বল

  • ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সুযোগ সীমিত

এটি শুধু আর্থিক সংকট নয়; এটি জীবনের শেষ অধ্যায়ের অনিশ্চয়তা।

সমাধানের দিকনির্দেশ

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসীদের জন্য জরুরি-

  • প্রবাসকালীন বাধ্যতামূলক দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়

  • ফেরার আগেই পুনর্বাসন পরিকল্পনা

  • বয়স উপযোগী কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ

  • প্রবাসী পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা স্কিম

  • মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সাপোর্ট

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নীতিনির্ধারণে তাদের অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া।

শেষ কথা

অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসীরা ব্যর্থ মানুষ নন। তারা ব্যর্থ হয়েছেন এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে, যা তাদের শ্রম নিয়েছে কিন্তু ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেনি। বিদেশ শেষে দেশে ফেরা যদি সত্যিই “নতুন শুরু” হতে হয়, তবে সেই শুরুর জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতিকে একসাথে প্রস্তুত হতে হবে।

না হলে অবসরপ্রাপ্ত প্রবাসীদের জীবনে এই দ্বিতীয় ধাক্কা-

প্রথম ধাক্কার চেয়েও বেশি নীরব, বেশি নিষ্ঠুর হয়ে থাকবে।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com