

বিদেশে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে ভয়াবহ যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন প্রবাসী শ্রমিকরা।
তা হলো- কাজ আছে, ঘাম আছে, কিন্তু বেতন নেই। মাসের পর মাস কাজ করার পরও বেতন না পাওয়া, আংশিক দেওয়া, কিংবা অভিযোগ তুললেই হুমকি, আটক বা দেশছাড়ার চাপ, এই চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিকভাবে একে বলা হয় Wage Theft একটি নীরব কিন্তু সংগঠিত শ্রমাধিকার লঙ্ঘন, যার সবচেয়ে বড় শিকার অভিবাসী শ্রমিকরা, বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মানুষ।
প্রশ্নটা তাই শুধু ‘বেতন বাকি কেন’ নয়; প্রশ্নটা হলো, অভিযোগ করার পর সেই অভিযোগের শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকে?
মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch একাধিক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে শত শত অভিবাসী শ্রমিক মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। সৌদি আরবে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে মক্কায় বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলন করায় শ্রমিকদের আটক করা হয়েছে, বেতন দেওয়ার বদলে এসেছে শাস্তি।
একই চিত্র দেখা গেছে মালয়েশিয়ায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Associated Press (AP), এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কয়েকশ’ বাংলাদেশি শ্রমিক একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেও বেতন পাননি। মামলা করার চেষ্টা করলেও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, ভাষাগত জটিলতা আর নিয়োগকর্তার প্রভাবের কারণে অনেকেই শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন।
কুয়েতে বকেয়া বেতন চাওয়াকে ‘আইন ভঙ্গ’ হিসেবে দেখিয়ে শ্রমিক আটক করার ঘটনাও স্থানীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে এসেছে। অর্থাৎ, বেতন না দেওয়া অপরাধ নয়; বেতন চাওয়া হয়ে ওঠে অপরাধ।
বেশিরভাগ শ্রম গ্রহণকারী দেশেই কাগজে-কলমে শ্রম আইন আছে। চুক্তিতে বেতন উল্লেখ থাকে, অভিযোগ করার প্রক্রিয়াও থাকে। কিন্তু বাস্তবে-
শ্রম আদালতে মামলা করতে সময় লাগে মাস নয়, বছর
মামলা চলাকালে শ্রমিকের ভিসা বৈধ থাকে না
কাজ করার অনুমতি না থাকায় জীবিকা বন্ধ
আইনজীবী, অনুবাদ, কোর্ট ফি, সব মিলিয়ে খরচ অসহনীয়
ফলে শ্রমিকের সামনে বাস্তব বিকল্প দাঁড়ায় দুটি-
ন্যায়বিচারের জন্য অনাহারে থাকা, নাকি অভিযোগ তুলে নিয়ে দেশে ফিরে যাওয়া।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এখনো পুরোপুরি কাটেনি কাফালা ব্যবস্থা। কাজ হারালে বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধে জড়ালে শ্রমিকের ভিসা ঝুঁকিতে পড়ে। এই নির্ভরশীলতাই নিয়োগকর্তাকে দেয় একচেটিয়া ক্ষমতা।
ফলে ওয়েজ থেফট এখানে কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র।
বাংলাদেশি দূতাবাসগুলো নিয়মিতই অভিযোগ গ্রহণ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-
একটি দূতাবাসে হাজার হাজার অভিযোগ
জনবল সীমিত
স্থানীয় আইনের ওপর নির্ভরশীলতা
অনেক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা
ফলে দূতাবাস অনেক সময় মধ্যস্থতার বেশি কিছু করতে পারে না। আইনি লড়াইয়ে নামলে শ্রমিক একা হয়ে পড়ে।
বেতন না পাওয়া মানে শুধু টাকা না পাওয়া নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়-
ঋণের বোঝা (দেশে রেখে যাওয়া পরিবার)
মানসিক চাপ ও হতাশা
আত্মসম্মান ভাঙন
দেশে ফিরে ‘ব্যর্থ প্রবাসী’ তকমা
এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রায় কখনোই নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয় না। ফেরত প্রবাসীর কণ্ঠস্বর এখানেই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত।
বাংলাদেশ বছরে বিপুল রেমিট্যান্স পায়। কিন্তু সেই রেমিট্যান্সের পেছনের শ্রমিকদের জন্য-
বিদেশে আইনি সহায়তার তহবিল দুর্বল
দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে বেতন সুরক্ষা দুর্বলভাবে সংজ্ঞায়িত
রিক্রুটিং এজেন্সির দায়বদ্ধতা কার্যকর নয়
অর্থাৎ, রেমিট্যান্সের ওপর রাষ্ট্র নির্ভরশীল, কিন্তু শ্রমিকের অধিকার প্রশ্নে রাষ্ট্র দুর্বল।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযোগের শেষ গিয়ে দাঁড়ায়-
✦ আংশিক বেতন
✦ দীর্ঘ অপেক্ষা
✦ কিংবা দেশে ফিরে আসা
ন্যায়বিচার খুব কম ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ হয়। কারণ এই ব্যবস্থাটি এমনভাবে গঠিত, যেখানে শ্রমিক সময়, অর্থ ও মানসিক শক্তি, সব হারিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন-
শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক শ্রম চুক্তি
বিদেশে শ্রম আদালতে মামলা চলাকালে বৈধ থাকার নিশ্চয়তা
ওয়েজ থেফটকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি
রিক্রুটিং এজেন্সির কঠোর জবাবদিহি
ফেরত প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা দিয়ে নীতিনির্ধারণ
ওয়েজ থেফট কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্য নয়, এটি একটি কাঠামোগত অন্যায়। যতদিন পর্যন্ত অভিযোগের পরিণতি ন্যায়বিচার না হয়, ততদিন পর্যন্ত বিদেশে কাজ করা মানে শুধু পরিশ্রম নয়, একটি ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া।
প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়-
প্রবাসে বেতন বাকি থাকলে, অভিযোগের শেষ কি আদৌ কোথাও পৌঁছায়?