

প্রবাসে বিপদে পড়লে একজন বাংলাদেশির প্রথম ভরসার জায়গা হওয়া উচিত নিজের দেশের দূতাবাস। পাসপোর্ট হারানো, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ, আটক বা গ্রেপ্তার, দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যু, এসব সংকটে দূতাবাসই হওয়ার কথা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী শেষ আশ্রয়। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে।
বহু প্রবাসীর কাছে প্রশ্নটি তাই ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস কি সত্যিই সেবা কেন্দ্র, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিক এক প্রশাসনিক কাঠামো?
কাগজে সেবা, বাস্তবে দূরত্ব
সরকারি বিবরণে দূতাবাসের দায়িত্বের তালিকা বেশ দীর্ঘ, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, আইনি সহায়তা, জরুরি কনস্যুলার সেবা, অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধান, প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় অনেক প্রবাসীই অভিযোগ করেন, দূতাবাসে গিয়ে তারা পান দীর্ঘ লাইনের ধৈর্যচ্যুতি, অস্পষ্ট তথ্য এবং কখনো কখনো সরাসরি অবহেলা।
একজন মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী শ্রমিকের অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম: নিয়োগকর্তা বেতন আটকে রাখলেও দূতাবাসে অভিযোগ জানাতে গিয়ে শুনতে হয়েছে- “এটা মালিকের বিষয়, আমরা কিছু করতে পারবো না।” অথচ শ্রম আইন অনুযায়ী এমন ক্ষেত্রে দূতাবাসের সক্রিয় হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে।
জরুরি সময়ে নিষ্ক্রিয়তা: সবচেয়ে বড় অভিযোগ
দূতাবাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ আসে জরুরি পরিস্থিতিতে নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে।
কোনো শ্রমিক আটক হলে দূতাবাসের পক্ষ থেকে সময়মতো আইনজীবী বা প্রতিনিধি পাঠানো হয় না
দুর্ঘটনায় আহত প্রবাসী হাসপাতালে ভর্তি হলেও দূতাবাসের কেউ খোঁজ নেয় না
প্রবাসী মৃত্যুর ক্ষেত্রে লাশ দেশে পাঠাতে পরিবারকে দালাল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়
এমন বহু ঘটনায় দেখা গেছে, দূতাবাসের হেল্পলাইনে ফোন করা হলেও রিসিভ করা হয়নি, অথবা “অফিস টাইমে আসুন” বলে দায় সারা হয়েছে। প্রবাসীদের কাছে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি মানবিক ব্যর্থতা।
শ্রম উইং: আছে, কিন্তু কতটা কার্যকর?
বেশিরভাগ দূতাবাসেই শ্রম উইং রয়েছে। কাগজে-কলমে এটি প্রবাসী শ্রমিকদের প্রধান সুরক্ষা কাঠামো। কিন্তু বাস্তবে শ্রম উইং অনেক সময় লোকবল সংকট, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং সীমিত ক্ষমতার অজুহাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
অনেক শ্রমিক অভিযোগ করেন-
অভিযোগ নেওয়া হলেও ফলোআপ হয় না
মাসের পর মাস মামলা ঝুলে থাকে
মালিকপক্ষের সঙ্গে দূতাবাস আপসের পথ নেয়
ফলে শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা জন্ম নেয়, দূতাবাসে অভিযোগ করলেও লাভ নেই।
দূরত্বের রাজনীতি: কর্মকর্তা বনাম শ্রমিক
আরেকটি বড় সমস্যা হলো মানসিক ও সামাজিক দূরত্ব। প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ মনে করেন, দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের সমস্যাকে “ঝামেলা” হিসেবে দেখেন। ভাষা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে এই ব্যবধান স্পষ্ট।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকলেও সাধারণ শ্রমিকদের দৈনন্দিন সমস্যার জন্য আলাদা গুরুত্ব বা সময় দেওয়া হয় না। ফলে দূতাবাস হয়ে ওঠে একটি এলিট প্রশাসনিক কেন্দ্র, সাধারণ প্রবাসীর নয়।
ইতিবাচক উদাহরণও আছে, কিন্তু তা ব্যতিক্রম
এটা বলা অন্যায় হবে যে সব দূতাবাসই ব্যর্থ। কিছু দেশে সক্রিয় রাষ্ট্রদূত ও কর্মকর্তাদের উদ্যোগে হেল্পডেস্ক, মোবাইল কনস্যুলার সার্ভিস, শ্রমিক ক্যাম্প পরিদর্শন ও আইনি সহায়তার ভালো উদাহরণও আছে।
কিন্তু সমস্যাটি হলো, এই উদ্যোগগুলো প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং ব্যক্তি-নির্ভর। কর্মকর্তা বদলালেই সেবার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে।
কাঠামোগত সমস্যা কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দূতাবাসের সেবা ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে-
পর্যাপ্ত লোকবল ও প্রশিক্ষণের অভাব
স্পষ্ট জবাবদিহির ঘাটতি
শ্রমিকবান্ধব নির্দেশনার দুর্বলতা
দূরবর্তী ক্যাম্প ও শহরে পৌঁছানোর সক্ষমতার অভাব
অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারিত না থাকা
এই দুর্বল কাঠামোর খেসারত দেন প্রবাসীরা।
করণীয়: আনুষ্ঠানিকতা থেকে সেবায় রূপান্তর
দূতাবাসকে সত্যিকারের সেবা কেন্দ্রে পরিণত করতে হলে কয়েকটি পরিবর্তন জরুরি-
২৪/৭ কার্যকর হেল্পলাইন ও রেসপন্স টিম
শ্রম উইং শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ
অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা
নিয়মিত ক্যাম্প পরিদর্শন ও কমিউনিটি সংলাপ
কর্মকর্তাদের জন্য শ্রমিকবান্ধব আচরণ ও মানবিক প্রশিক্ষণ
প্রবাসীদের জন্য পারফরম্যান্স ফিডব্যাক ব্যবস্থার চালুওফি
শেষ কথা
প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না, তারা দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখেন, সংকটে রাষ্ট্রকে শক্ত করেন। সেই প্রবাসীদের জন্য যদি দূতাবাস কেবল কাগুজে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক প্রশ্নের মুখে পড়ে।
দূতাবাস মানে শুধু পতাকা ও প্রটোকল নয়, দূতাবাস মানে সুরক্ষা, আস্থা ও মানবিক সহায়তা।
এই সত্য যতদিন নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত না হবে, ততদিন প্রবাসীর প্রশ্ন থেকেই যাবে,
দূতাবাস কি সত্যিই আমাদের জন্য, নাকি শুধু রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার অংশ?