

বিদেশে যাওয়ার সময় অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসীর মুখে একটি বাক্য খুব পরিচিত, “কিছু বছর কষ্ট করি, তারপর দেশে ফিরে স্থায়ী হবো।”
এই স্বপ্ন নিয়েই কেউ মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণসাইটে কাজ শুরু করেন, কেউ ইউরোপে রেস্টুরেন্টে, কেউ আবার উত্তর আমেরিকায় ট্যাক্সি চালিয়ে কিংবা ছোট ব্যবসা গড়ে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই “ফিরে আসা”র পরিকল্পনা ধীরে ধীরে অনিশ্চিত হয়ে যায়।
পাঁচ বছর দশ বছরে গড়ায়, তারপর দুই দশক পার হয়ে যায়, তবু দেশে ফেরা আর হয় না।
অনেকের জন্য “দেশে ফিরবো” একটি আবেগ হয়ে থাকে, বাস্তবতা নয়।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়; বরং পরিবার, সন্তান, পরিচয়, নিরাপত্তা, সামাজিক মানসিকতা, জীবনযাত্রা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জটিল সমন্বয় কাজ করে।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া অধিকাংশ মানুষই প্রথমে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে যান না।
প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে-
অর্থনৈতিক স্থিতি অর্জন
পরিবারকে সহায়তা করা
ঋণ শোধ করা
বাড়ি নির্মাণ
সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়া
কিছু সঞ্চয় করে দেশে ফিরে ব্যবসা করা
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমজীবী প্রবাসীদের বড় অংশ নিজেদের “অস্থায়ী উপার্জনকারী” হিসেবেই ভাবেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশের বাস্তবতা এবং দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়।
প্রবাসীদের দেশে না ফেরার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠছে তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ।
প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীরা হয়তো কষ্ট করে থেকেছেন এই আশায় যে একসময় দেশে ফিরবেন। কিন্তু তাদের সন্তানরা বড় হয়েছে বিদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নাগরিক ব্যবস্থার মধ্যে।
ফলে তৈরি হয় একটি দ্বৈত বাস্তবতা-
বাবা-মায়ের আবেগ দেশের সঙ্গে
সন্তানের পরিচয় বিদেশের সঙ্গে
অনেক সন্তান বাংলা ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, বাংলাদেশের শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না।
তারা নিজেদের “বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত” ভাবলেও জীবনদর্শন, পেশাগত পরিকল্পনা এবং সামাজিক মানসিকতায় স্থানীয় সমাজের অংশ হয়ে ওঠে।
ফলে বাবা-মা বুঝতে পারেন, দেশে ফিরে গেলে সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হতে পারে।
এই জায়গাতেই “শিকড়” এবং “ভবিষ্যৎ”র মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাত তৈরি হয়।
দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর অনেক প্রবাসী এমন কিছু নাগরিক সুবিধার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, যা দেশে ফিরে সমানভাবে পাওয়া কঠিন।
যেমন-
উন্নত স্বাস্থ্যসেবা
তুলনামূলক স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা
নিরবচ্ছিন্ন নাগরিক সেবা
পরিকল্পিত নগরব্যবস্থা
সামাজিক নিরাপত্তা
পেনশন বা বয়স্কভাতা
শিক্ষার মান ও সুযোগ
ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই বিদেশকেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
বিশেষ করে যেসব দেশে স্থায়ী নাগরিকত্ব, স্বাস্থ্যসেবা ও অবসরকালীন সুবিধা শক্তিশালী, সেসব দেশে দীর্ঘমেয়াদি থেকে যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করেও পুনরায় বিদেশে চলে যান।
কারণ দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর দেশে ফিরে তারা প্রায়ই যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হন-
সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন
আত্মীয়স্বজনের অতিরিক্ত প্রত্যাশা
প্রশাসনিক জটিলতা
ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা
দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক ভোগান্তি
জীবনযাত্রার অগোছালো বাস্তবতা
ফলে তারা অনুভব করেন-
দেশ তাদের আবেগের জায়গা হলেও, জীবনযাপনের বাস্তবতায় তারা আর পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারছেন না।
অন্যদিকে বিদেশেও তারা পুরোপুরি “নিজের মানুষ” নন।
এই অবস্থাকে অনেক সমাজবিজ্ঞানী “In-between Identity” বা মধ্যবর্তী পরিচয় সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
বিদেশে বহু বছর কাজ করার পরও অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন না।
কারণ
বিদেশের আয়ের সমমানের আয় দেশে পাওয়া কঠিন
সঞ্চয় অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও ব্যয়ে শেষ হয়ে যায়
বিনিয়োগে প্রতারণার শিকার হন
পরিকল্পনাহীন ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হন
ফলে “দেশে ফিরে শান্তিতে থাকা”র পরিকল্পনা বাস্তবে টেকসই হয় না।
বিশেষ করে যাদের সন্তান বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে বা স্থায়ী হয়েছে, তাদের জন্য দেশে ফিরে পুরো পরিবার নিয়ে নতুনভাবে শুরু করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে থাকতে থাকতে প্রবাসীদের জীবনে নতুন এক সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়।
তাদের-
বন্ধু
পেশাগত নেটওয়ার্ক
ব্যবসা
সামাজিক পরিচয়
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কমিউনিটি
সবকিছুই ধীরে ধীরে সেই দেশের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
ফলে “ফিরে যাওয়া” শুধু ভৌগোলিক সিদ্ধান্ত থাকে না; বরং একটি পূর্ণ জীবনব্যবস্থা বদলে ফেলার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রবাসী পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে আবেগ থাকলেও বাস্তবিক সংযোগ অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে।
তারা হয়তো বছরে একবার দেশে আসে, আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করে, বাংলা খাবার পছন্দ করে, কিন্তু তাদের পেশা, শিক্ষা, বন্ধু, নাগরিক পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিদেশকেন্দ্রিক।
ফলে বাবা-মায়ের “দেশে ফিরে যাই” স্বপ্নটি সন্তানদের কাছে প্রায়ই বাস্তবসম্মত মনে হয় না।
অনেক ক্ষেত্রে সন্তান সরাসরি জানিয়ে দেয়-
“আমরা বাংলাদেশে স্থায়ী হতে চাই না।”
এই মুহূর্তটি অনেক প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীর জন্য আবেগগতভাবে অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।
প্রবাসীদের বড় একটি অংশ মনে মনে যে বাংলাদেশকে ধারণ করেন, বাস্তবের বাংলাদেশ অনেক সময় তার সঙ্গে মেলে না।
কারণ তারা যে দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন, সেই দেশ সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে-
শহর বদলেছে
মানুষ বদলেছে
সামাজিক সম্পর্ক বদলেছে
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে
ফলে দীর্ঘদিন পর ফিরে এসে অনেকেই এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেন।
দেশ তখন স্মৃতির জায়গা হয়ে থাকে, কিন্তু প্রতিদিনের জীবনের জায়গা হয়ে ওঠে না।
পুরোপুরি নয়।
অনেক প্রবাসী এখনও দেশে ফিরে-
ব্যবসা করছেন
অবসরজীবন কাটাচ্ছেন
সামাজিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করছেন
তবে বাস্তবতা হলো, আধুনিক অভিবাসন এখন আর শুধু “বিদেশে গিয়ে টাকা উপার্জন” নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি জীবনব্যবস্থা, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।
১. প্রবাসীবান্ধব পুনর্বাসন নীতি
দেশে ফিরে বিনিয়োগ, ব্যবসা ও নাগরিক সেবা সহজ করা প্রয়োজন।
২. প্রবাসী সন্তানদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগ বাড়ানো
বাংলা শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে দ্বিতীয় প্রজন্মকে যুক্ত রাখার উদ্যোগ প্রয়োজন।
৩. নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ
প্রবাসীদের সঞ্চয় যাতে প্রতারণা বা অনিশ্চয়তায় হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. “রেমিট্যান্স মেশিন” নয়, মানুষ হিসেবে দেখা
প্রবাসীদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হিসেবে নয়, সামাজিক ও মানবিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।
প্রবাসীদের অনেকেই হয়তো শেষ পর্যন্ত বিদেশেই স্থায়ী হয়ে যান। কিন্তু তাদের ভেতরে “ফিরে যাওয়ার” অনুভূতিটি পুরোপুরি মরে যায় না।
কারণ জন্মভূমি শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; এটি স্মৃতি, ভাষা, শৈশব, পরিচয় এবং আবেগের সমষ্টি।
তবু বাস্তবতার কঠিন সমীকরণে অনেক সময় ভবিষ্যৎ জয়ী হয়, আর শিকড় ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হয়।