রেমিট্যান্স নির্ভরতা কি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে?

রেমিট্যান্স নির্ভরতা কি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে?
প্রকাশিত

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের চালিকা শক্তি, বৈদেশিক লেনদেনের রক্ষাকবচ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার একটি নীরব স্তম্ভ। প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থে পরিবার টিকে থাকে, বাজার সচল থাকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্ত হয়।

কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে ধীরে ধীরে একটি প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে- রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে?

রেমিট্যান্স: আশীর্বাদ না নীরব ফাঁদ?

রেমিট্যান্স স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিকে স্বস্তি দেয়। মুদ্রাস্ফীতি সামাল দিতে সাহায্য করে, আমদানি ব্যয় মেটায়, গ্রামীণ দরিদ্রতা কমায়। কিন্তু উন্নয়ন অর্থনীতির দৃষ্টিতে কোনো একটি খাতে অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

যখন একটি দেশ তার বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করে, তখন দেশীয় উৎপাদন, শিল্পায়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে রাষ্ট্রের প্রণোদনা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অর্থনীতিবিদরা একে বলেন “রেমিট্যান্স কমফোর্ট জোন”, যেখানে সহজ আয় কঠিন সংস্কারকে পিছিয়ে দেয়।

বৈশ্বিক ধাক্কায় অরক্ষিত অর্থনীতি

রেমিট্যান্সের বড় ঝুঁকি হলো- এটি দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

  • মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা তেলের দাম পতন

  • উন্নত দেশে মন্দা বা অভিবাসন নীতির কঠোরতা

  • প্রযুক্তিগত অটোমেশন ও শ্রম চাহিদা হ্রাস

এই সবকিছুই এক রাতের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধাক্কা দিতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় লাখো প্রবাসীর চাকরি হারানো ও দেশে ফেরা এই বাস্তবতার নগ্ন উদাহরণ।

তখন বোঝা গেছে, রেমিট্যান্স নির্ভর অর্থনীতি কতটা বহির্ভূত ঝুঁকির মুখে।

শ্রম রপ্তানি বনাম মানবসম্পদ উন্নয়ন

বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ কমদক্ষ বা অর্ধদক্ষ। এর ফলে রেমিট্যান্স আসে, কিন্তু তুলনামূলক কম মূল্যে শ্রম রপ্তানি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবসম্পদের অপচয় তৈরি করে।

যখন তরুণেরা দেশে উচ্চ দক্ষতা ও উদ্ভাবনী খাতে যুক্ত হওয়ার বদলে বিদেশে কম মজুরির শ্রমে ঝুঁকে পড়ে, তখন দেশ হারায় সম্ভাব্য উদ্যোক্তা, গবেষক ও শিল্পনেতা। এটি এক ধরনের ব্রেইন আন্ডারইউটিলাইজেশন, যেখানে মেধা আছে, কিন্তু সঠিক ব্যবহারের সুযোগ নেই।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিকৃত প্রণোদনা

রেমিট্যান্স গ্রামে স্বস্তি আনে, কিন্তু একই সঙ্গে কিছু বিকৃত প্রণোদনাও তৈরি করে। অনেক পরিবার নিয়মিত প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, কৃষি বা স্থানীয় উৎপাদন কার্যক্রমে আগ্রহ হারায়।

ফলে জমি অনাবাদি থাকে, স্থানীয় শ্রমের সংকট তৈরি হয়, এবং গ্রামীণ উৎপাদনশীলতা কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় এটি “ডাচ ডিজিজ”-এর নরম সংস্করণ, যেখানে বৈদেশিক আয়ের প্রাচুর্য স্থানীয় উৎপাদনকে দুর্বল করে।

রেমিট্যান্স ও ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধি

রেমিট্যান্সের বড় অংশ খরচ হয় ভোগে- ঘরবাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা, ভোগ্যপণ্য, সামাজিক অনুষ্ঠানে। বিনিয়োগে রূপান্তরের হার তুলনামূলক কম। ফলে প্রবৃদ্ধি হয়, কিন্তু তা হয় ভোগনির্ভর, টেকসই উৎপাদনভিত্তিক নয়।

দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা অর্থনীতিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ফাঁদে ফেলতে পারে, যেখানে জিডিপি বাড়ে কিন্তু কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ে না।

তবে রেমিট্যান্সই সমস্যা নয়

এখানে স্পষ্ট করা জরুরি- সমস্যা রেমিট্যান্স নয়, সমস্যা হলো রেমিট্যান্স ব্যবহারের কৌশল। দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনাম প্রবাসী আয়ের বড় অংশ দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজে লাগিয়েছে।

বাংলাদেশও চাইলে রেমিট্যান্সকে ব্যবহার করতে পারে-

  • এসএমই ও স্টার্টআপ বিনিয়োগে

  • প্রবাসী বন্ড ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে

  • প্রযুক্তি ও দক্ষতা প্রশিক্ষণে

  • রপ্তানিমুখী শিল্প বিস্তারে

তখন রেমিট্যান্স হবে ঝুঁকি নয়, বরং রূপান্তরের হাতিয়ার।

নীতিগত করণীয়: নির্ভরতা থেকে রূপান্তর

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্স নির্ভরতা কমাতে নয়, রেমিট্যান্সকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন-

  • দক্ষ শ্রমিক রপ্তানিতে জোর

  • দেশে শিল্প ও কর্মসংস্থান বিস্তারে প্রবাসী বিনিয়োগ আকর্ষণ

  • রেমিট্যান্স-নির্ভর পরিবারকে উৎপাদনমুখী উদ্যোগে যুক্ত করা

  • অভিবাসন কূটনীতি শক্তিশালী করা

  • বহুমুখী বৈদেশিক আয়ের উৎস তৈরি

শেষ কথা

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যদি এটি একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে। অর্থনীতির ইতিহাস বলে, টেকসই উন্নয়ন আসে তখনই, যখন বৈদেশিক আয়ের ওপর নির্ভরতা কমে এবং দেশীয় উৎপাদন, দক্ষতা ও উদ্ভাবন শক্ত হয়।

প্রশ্নটি তাই রেমিট্যান্স ছাড়বো কি না নয়।

প্রশ্ন হলো, রেমিট্যান্সকে আমরা ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার বানাতে পারছি কি না।

এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে- রেমিট্যান্স বাংলাদেশের শক্তি থাকবে, নাকি এক সময় নীরব দুর্বলতায় পরিণত হবে।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com