

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান নিয়ে আলোচনা হলেই প্রথমে আসে রেমিট্যান্সের কথা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ডলার সংকট মোকাবিলা, গ্রামীণ অর্থনীতির সচলতা, সব ক্ষেত্রেই প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব বিশাল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক সময় রেকর্ডও ছুঁয়েছে। কিন্তু এই উজ্জ্বল পরিসংখ্যানের আড়ালে আরেকটি নীরব বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে-
প্রবাসীদের আয় বাড়লেও অনেকের ব্যক্তিগত সঞ্চয় বাড়ছে না, বরং কমছে।
অসংখ্য প্রবাসী বছরের পর বছর বিদেশে কাজ করেও আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তুলতে পারছেন না। কেউ ঋণের চক্রে আটকে যাচ্ছেন, কেউ পরিবারের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশার চাপে ভেঙে পড়ছেন, আবার কেউ জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে গিয়েই সঞ্চয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন।
অর্থাৎ, রেমিট্যান্সের সামষ্টিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রবাসীর ব্যক্তিগত আর্থিক স্থিতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।
রেমিট্যান্স বাড়া মানেই যে প্রতিটি প্রবাসীর জীবন অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হচ্ছে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
কারণ মোট রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে একাধিক বিষয় কাজ করে-
* বিদেশে কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি
* বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা
* মুদ্রা বিনিময় হারের পরিবর্তন
* সংকটকালে পরিবারের অতিরিক্ত অর্থচাহিদা
* প্রবাসীদের অতিরিক্ত ওভারটাইম কাজ
ফলে দেশের অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়লেও একজন প্রবাসী ব্যক্তিগতভাবে হয়তো আগের চেয়ে বেশি আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছেন।
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি প্রবাসীদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে-
* বাড়িভাড়া
* খাবারের খরচ
* যাতায়াত
* স্বাস্থ্যসেবা
* ভিসা ও আবাসন নবায়ন
* বীমা
* ইউটিলিটি বিল
এসব খাতে ব্যয় অনেক দেশে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ কিংবা উত্তর আমেরিকায় কর্মরত প্রবাসীদের বড় অংশই এখন আগের তুলনায় দৈনন্দিন খরচে বেশি অর্থ ব্যয় করছেন।
ফলে হাতে থাকা সঞ্চয়যোগ্য অর্থ কমে যাচ্ছে, যদিও দেশে পাঠানো টাকার পরিমাণ অনেক সময় কমানো সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশি সমাজে প্রবাসী সদস্যকে প্রায়ই পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক ভরসা হিসেবে দেখা হয়।
ফলে একজন প্রবাসীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে-
* বাবা-মা
* ভাইবোন
* স্ত্রী-সন্তান
* আত্মীয়স্বজন
* পারিবারিক ব্যবসা
* বাড়ি নির্মাণ বা জমি কেনা
অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের চাহিদা ধীরে ধীরে “প্রয়োজন” থেকে “অভ্যাসে” পরিণত হয়।
ফলে প্রবাসী ব্যক্তি নিজে কষ্টে থাকলেও দেশে নিয়মিত টাকা পাঠানো বন্ধ করতে পারেন না।
এই মানসিক ও সামাজিক চাপ অনেকের আর্থিক পরিকল্পনাকে দুর্বল করে দেয়।
বিদেশে যাওয়ার আগে বিপুলসংখ্যক প্রবাসীকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়।
বিশেষ করে-
* ভিসা খরচ
* দালাল কমিশন
* বিমানভাড়া
* নথিপত্র
* অননুমোদিত “প্রসেসিং ফি”
এসব মিলিয়ে অনেক সময় কয়েক লাখ থেকে ১৫–২০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
এই অর্থের বড় অংশই আসে-
* জমি বিক্রি করে
* এনজিও ঋণ থেকে
* সুদে ধার করে
* আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার নিয়ে
ফলে বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর অনেক প্রবাসীর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ঋণ শোধ করা।
অর্থাৎ আয় শুরু হলেও প্রকৃত সঞ্চয় তৈরি হয় না।
সোশ্যাল মিডিয়া ও সামাজিক প্রতিযোগিতা প্রবাসীদের ওপর নতুন ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
অনেকেই দেশে নিজেদের সফল প্রমাণ করতে গিয়ে-
* দামি মোবাইল
* গাড়ি
* বাড়ি নির্মাণ
* বিলাসী উপহার
* সামাজিক অনুষ্ঠানে বড় খরচ করতে বাধ্য হন।
কারণ সমাজে এখনও একটি ধারণা শক্তিশালী- “বিদেশে থাকে মানেই অনেক টাকা।” ফলে বাস্তব আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সামাজিক প্রত্যাশার ফারাক বাড়তে থাকে।
অনেক প্রবাসী দিনে ১০–১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন।
কিন্তু তাদের বড় অংশই নিম্ন বা মধ্য আয়ের শ্রমখাতে যুক্ত থাকায়-
বেতন স্থির থাকে
ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করতে হয়
চাকরির নিরাপত্তা কম থাকে
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে
ফলে দীর্ঘ পরিশ্রম সত্ত্বেও আর্থিক অগ্রগতি সীমিত হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শ্রমিক বহু বছর কাজ করেও পর্যাপ্ত সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারেন না।
দীর্ঘ প্রবাসজীবনে অনেকের জীবন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়-
* বিদেশে নিজের খরচ
* দেশে পরিবারের খরচ
অর্থাৎ একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামলাতে হয়।
যাদের সন্তান বিদেশে পড়াশোনা করছে বা পরিবার পরে বিদেশে নিয়ে গেছেন, তাদের ক্ষেত্রে ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
ফলে উচ্চ আয় থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত সঞ্চয় কমে যায়।
বাংলাদেশে যেমন মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বিদেশেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
বিশেষ করে কোভিড-পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী-
* খাদ্যমূল্য
* জ্বালানি ব্যয়
* বাসাভাড়া
* স্বাস্থ্যখরচ
বাড়ায় প্রবাসীদের আর্থিক চাপও বেড়েছে।
অনেক দেশে একই বেতনে আগের তুলনায় কম সঞ্চয় সম্ভব হচ্ছে।
অনেক প্রবাসী দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা ছাড়া কাজ করেন।
যেমন-
* সঞ্চয় ব্যবস্থাপনা নেই
* বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেই
* অবসরকালীন পরিকল্পনা নেই
* বীমা কাঠামো নেই
ফলে বহু বছর কাজ করার পরও আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে ওঠে না।
কিছু ক্ষেত্রে পরিবার বা আত্মীয়দের অনিয়ন্ত্রিত অর্থচাহিদাও পরিস্থিতি জটিল করে তোলে।
বিদেশে বহু বছর কাজ করার পর দেশে ফিরে অনেক প্রবাসী বুঝতে পারেন-
* স্থায়ী আয় নেই
* সঞ্চয় পর্যাপ্ত নয়
* বিনিয়োগ টেকসই হয়নি
* সন্তানদের ভবিষ্যৎ ব্যয়বহুল
* চিকিৎসা ও বার্ধক্য নিরাপত্তা অনিশ্চিত
ফলে “বিদেশে অনেক বছর কাজ করেছি”, এই বাস্তবতা সবসময় “অর্থনৈতিক নিরাপত্তা” নিশ্চিত করে না।
বিশ্বের অনেক দেশ এখন কম দক্ষ শ্রমের বদলে দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মী চাইছে।
AI, অটোমেশন এবং ডিজিটালাইজেশনের কারণে ভবিষ্যতে নিম্নদক্ষ শ্রমের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
ফলে, শুধু বিদেশে কাজ পাওয়া নয়, “স্থিতিশীল ও উচ্চ আয়ের দক্ষতা” অর্জনই ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
১. অভিবাসন খরচ নিয়ন্ত্রণ- বিদেশগামী কর্মীদের অতিরিক্ত দালাল খরচ কমাতে হবে।
২. আর্থিক সচেতনতা বাড়ানো- প্রবাসীদের জন্য সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও অবসর পরিকল্পনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
৩. দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন- উচ্চ আয়ের দক্ষ পেশায় প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।
৪. প্রবাসীবান্ধব ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ- নিরাপদ বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় স্কিম প্রয়োজন।
৫. পরিবারের অর্থনৈতিক সচেতনতা- প্রবাসী সদস্যকে “অসীম আয়ের উৎস” হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে।
৬. পুনর্বাসন পরিকল্পনা- দেশে ফিরে প্রবাসীদের জন্য টেকসই অর্থনৈতিক পুনর্বাসন কাঠামো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান না; তারা নিজেদের শ্রম, সময়, পরিবার থেকে দূরত্ব এবং জীবনের বড় অংশও বিনিয়োগ করেন।
কিন্তু যদি বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পরও একজন প্রবাসী ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক নিরাপত্তা অর্জন করতে না পারেন, তাহলে শুধু রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যান দিয়ে সেই বাস্তবতা বোঝা সম্ভব নয়।
আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো এটিই-
বাংলাদেশ কি শুধু রেমিট্যান্সের পরিমাণ দেখছে, নাকি প্রবাসীদের প্রকৃত আর্থিক ও মানবিক অবস্থার দিকেও যথেষ্ট নজর দিচ্ছে?