মধ্যপ্রাচ্যে “লোকালাইজেশন” নীতি: বাংলাদেশি শ্রমবাজার কতটা ঝুঁকিতে?

মধ্যপ্রাচ্যে “লোকালাইজেশন” নীতি: বাংলাদেশি শ্রমবাজার কতটা ঝুঁকিতে?
প্রকাশিত

দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার কিংবা বাহরাইনের নির্মাণ, পরিষেবা, পরিবহন ও গৃহকর্ম খাতে লাখো বাংলাদেশি কাজ করছেন।

এই অভিবাসন শুধু ব্যক্তিগত আয়ের পথ নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দ্রুত জোরদার হয়েছে একটি নতুন নীতি- “লোকালাইজেশন”।

সৌদি আরবে “সৌদিকরণ”, ওমানে “ওমানাইজেশন”, কুয়েতে জাতীয়করণ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে “এমিরাতাইজেশন”, সবগুলোর মূল লক্ষ্য একটাই: নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য বেশি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানো।

এই পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো শ্রমরপ্তানিনির্ভর দেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে যে শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীরা প্রবেশ করতেন, সেই বাজার এখন ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হচ্ছে।

লোকালাইজেশন নীতি আসলে কী?

লোকালাইজেশন হলো এমন একটি নীতি, যার মাধ্যমে কোনো দেশ নির্দিষ্ট খাতে স্থানীয় নাগরিকদের নিয়োগ বাধ্যতামূলক বা অগ্রাধিকারভিত্তিক করে।

এর আওতায় সরকার সাধারণত-

* নির্দিষ্ট খাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ সীমিত করে

* কোম্পানির জন্য স্থানীয় কর্মী কোটার বাধ্যবাধকতা দেয়

* বিদেশি ভিসা কমায়

* কিছু পেশা পুরোপুরি স্থানীয়দের জন্য সংরক্ষিত করে

* বেসরকারি খাতে স্থানীয় কর্মী নিয়োগে প্রণোদনা দেয়

এই নীতির পেছনে মূল কারণ হলো-

মধ্যপ্রাচ্যের তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক নির্ভরতা পুনর্বিন্যাস করা।

কেন মধ্যপ্রাচ্য এখন এই পথে হাঁটছে?

দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বিদেশি শ্রমিকনির্ভর ছিল। অনেক দেশে স্থানীয় নাগরিকের তুলনায় বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।

কিন্তু গত এক দশকে কয়েকটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে-

১. তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের চাপ

সৌদি আরব, ওমান ও কুয়েতে তরুণ জনগোষ্ঠী দ্রুত বাড়ছে। সরকারগুলো এখন তাদের জন্য চাকরি নিশ্চিত করতে চায়।

২. তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা

“ভিশন ২০৩০” ধরনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশগুলো নতুন শিল্প ও সেবা খাত গড়ে তুলছে।

৩. রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ

নিজ দেশের নাগরিকদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়লে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হয়।

৪. মহামারি-পরবর্তী পুনর্গঠন

কোভিডের পর অনেক দেশ শ্রমবাজার নতুনভাবে সাজিয়েছে।

অর্থাৎ লোকালাইজেশন শুধু সাময়িক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ।

সৌদিকরণ: সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের কেন্দ্র

সৌদি আরবের “সৌদিকরণ” বা “নিতাকাত” নীতি বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত।

এর আওতায়-

* খুচরা বিক্রয়

* কাস্টমার সার্ভিস

* প্রশাসনিক কাজ

* ব্যাংকিং

* টেলিকম

* বিপণন

* হোটেল ও সেবা খাতের অনেক চাকরি

ধীরে ধীরে সৌদি নাগরিকদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক করা হচ্ছে। ফলে, বিদেশি কর্মীদের জন্য কিছু নিম্ন ও মধ্য দক্ষতার চাকরি সংকুচিত হচ্ছে। বাংলাদেশি কর্মীরা ঐতিহ্যগতভাবে যে খাতগুলোতে বেশি কাজ করতেন, তার কিছু অংশ এখন স্থানীয়দের দিকে সরে যাচ্ছে।

ওমানাইজেশন ও কুয়েতের জাতীয়করণ

ওমানও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা কমাতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

বিশেষ করে-

* দোকান বিক্রয়কর্মী

* প্রশাসনিক চাকরি

* অফিস সহকারী

* বিপণন ও সেবা খাত

এ ধরনের কাজ স্থানীয়দের জন্য সংরক্ষণের প্রবণতা বেড়েছে। কুয়েতেও সরকারি খাতে বিদেশি কর্মী কমানোর আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চলছে।

যদিও বাস্তবে সব খাতে দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব হয়নি, তবু নীতিগতভাবে উপসাগরীয় দেশগুলো বিদেশি শ্রমনির্ভরতা কমানোর দিকেই এগোচ্ছে।

বাংলাদেশি শ্রমবাজারের জন্য ঝুঁকি কোথায়?

১. নিম্নদক্ষ শ্রমের চাহিদা কমে যাওয়া

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকদের বড় অংশ এখনও-

* নির্মাণশ্রম

* পরিচ্ছন্নতা

* সাধারণ সেবা

* ড্রাইভিং

* নিম্নপ্রযুক্তির কাজ

এসব খাতে যুক্ত।

লোকালাইজেশন নীতির কারণে এই খাতগুলোর কিছু অংশে বিদেশি কর্মীর সুযোগ কমতে পারে।

২. ভিসা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা

* কিছু দেশে নির্দিষ্ট পেশার জন্য নতুন বিদেশি ভিসা সীমিত করা হচ্ছে।

ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রবেশ আগের মতো সহজ নাও থাকতে পারে।

৩. বেতন প্রতিযোগিতা বাড়বে

যেসব খাতে বিদেশি কর্মী থাকবে, সেখানে আরও কম খরচে শ্রম নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

ফলে কর্মপরিবেশ ও বেতন নিয়ে চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

৪. অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি

বৈধ সুযোগ কমে গেলে কিছু মানুষ দালালনির্ভর বা অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, যা মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়ায়।

তবে কি বাংলাদেশিদের জন্য দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?

পুরোপুরি নয়। বরং শ্রমবাজারের ধরন বদলাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন একদিকে নিম্নদক্ষ বিদেশি শ্রম কমাতে চাইলেও অন্যদিকে তারা এখনও ব্যাপকভাবে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন অনুভব করছে।

বিশেষ করে-

* স্বাস্থ্যসেবা

* নির্মাণ প্রকৌশল

* অবকাঠামো প্রযুক্তি

* আইটি সাপোর্ট

* নবায়নযোগ্য জ্বালানি

* লজিস্টিকস

* মেশিন অপারেশন

* কেয়ার সেবা

এসব খাতে দক্ষ বিদেশি কর্মীর চাহিদা এখনও রয়েছে।

অর্থাৎ “যেকোনো শ্রমিক”র চাহিদা কমলেও “দক্ষ শ্রমিক”র চাহিদা পুরোপুরি কমছে না।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট: দক্ষতার ঘাটতি

বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো-

* দেশ এখনও প্রধানত “লো-স্কিল” শ্রম রপ্তানিনির্ভর।

* অনেক কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন সীমিত প্রশিক্ষণ ও ভাষা দক্ষতা নিয়ে।

ফলে তারা সহজেই প্রতিস্থাপনযোগ্য হয়ে পড়েন।

অন্যদিকে ফিলিপাইন, ভারত বা কিছু আফ্রিকান দেশ ইতোমধ্যে-

* নার্সিং

* টেকনিক্যাল ট্রেড

* স্বাস্থ্যসেবা

* জাহাজশিল্প

* ডিজিটাল সাপোর্ট

এসব ক্ষেত্রে বিশেষায়িত দক্ষ জনবল তৈরি করছে।

AI ও অটোমেশনও নতুন চাপ তৈরি করছে

লোকালাইজেশনের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এখন-

* স্মার্ট সিটি

* অটোমেটেড সার্ভিস

* AI-ভিত্তিক প্রশাসন

* স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস

ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করছে।

ফলে কম দক্ষ শ্রমের প্রয়োজন ভবিষ্যতে আরও কমতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কী করণীয়?

১. “জনশক্তি” নয়, “দক্ষ জনশক্তি” রপ্তানিতে জোর- কারিগরি ও পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে।

২. ভাষা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা- আরবি ও ইংরেজিতে পেশাগত যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে হবে।

৩. নতুন শ্রমবাজার খোঁজা- শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও কেয়ার সেক্টরে প্রবেশ বাড়াতে হবে।

৪. আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন- বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতার বৈশ্বিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।

৫. পুনঃদক্ষতা (Reskilling) প্রোগ্রাম- বিদেশফেরত কর্মীদের নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

রেমিট্যান্স অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কি ঝুঁকিতে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনও মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত।

ফলে যদি নিম্নদক্ষ শ্রমের সুযোগ দীর্ঘমেয়াদে কমে যায়, তাহলে-

* নতুন কর্মসংস্থান কমতে পারে

* রেমিট্যান্স প্রবাহে চাপ আসতে পারে

* গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে

* অভিবাসন ব্যয় ও প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে

তবে, একই সঙ্গে এটি একটি সুযোগও হতে পারে- বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসনে রূপান্তর ঘটাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের লোকালাইজেশন নীতি কি বাংলাদেশের জন্য হুমকি?

হ্যাঁ, যদি বাংলাদেশ পুরোনো “কম দক্ষ শ্রম রপ্তানি” মডেলেই আটকে থাকে।

কিন্তু এটি একই সঙ্গে একটি সতর্কবার্তাও-

বিশ্বের শ্রমবাজার বদলে যাচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে শুধু বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা নয়, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতাই নির্ধারণ করবে কারা টিকে থাকবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-

দেশ কি এখনও শুধু শ্রমিক পাঠাতে চায়, নাকি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে প্রস্তুত?

logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com