

দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের ভোটাধিকার ছিল প্রতিশ্রুতি আর প্রত্যাশার মাঝখানে আটকে থাকা একটি প্রশ্ন। সংবিধানে অধিকার থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ ছিল অনুপস্থিত। কিন্তু এবার সেই বাস্তবতা বদলাতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় এটি আর পরিকল্পনার স্তরে নেই, এটি এখন বাস্তবায়নের পথে।
এটি শুধু একটি নতুন ভোটিং পদ্ধতির সূচনা নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের ভোটাধিকারকে কোনো ভৌগোলিক সীমার মধ্যে বেঁধে দেয়নি। কিন্তু বাস্তবে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকরা দীর্ঘদিন এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। ভোট দিতে হলে দেশে ফিরতে হতো, যা অধিকাংশ প্রবাসীর জন্য সময়, অর্থ ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে প্রায় অসম্ভব।
পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে সেই কাঠামোগত বাধা ভাঙা হলো। এবার প্রবাসীরা দেশের বাইরে থেকেই তাদের রাজনৈতিক মতামত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে যুক্ত করতে পারবেন। এটি নাগরিকত্বের ধারণাকে আরও পূর্ণতা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী ভোটাধিকার বাস্তবায়নে পোস্টাল ব্যালট সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। কারণ-
দূতাবাসভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনের লজিস্টিক জটিলতা কমে
ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা সহজ হয়
ব্যয় তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে
নিরাপত্তা ঝুঁকি কম
বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ সেই অভিজ্ঞতার পথেই এগোচ্ছে।
প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানো জনগোষ্ঠী নন। বতারা সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাদের ভোট যুক্ত হওয়া মানে নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি নতুন, তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ভোটব্যাংক যুক্ত হওয়া।
কারণ প্রবাসীরা-
স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে
প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত
অনেক বেশি ইস্যুভিত্তিক সিদ্ধান্তে আগ্রহী
এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি, প্রবাসী কল্যাণ ও অভিবাসন কূটনীতিতে নতুন গুরুত্ব আসতে পারে।
যদিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন- বাস্তবায়নের গুণগত মানই এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো হলো-
ব্যালট সময়মতো প্রবাসীদের কাছে পৌঁছানো
সঠিক ও হালনাগাদ ঠিকানা নিশ্চিত করা
ব্যালট ফেরত আসার সময়সীমা বাস্তবসম্মত করা
প্রবাসীদের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি
এই জায়গাগুলোতে সামান্য দুর্বলতাও পুরো উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
পোস্টাল ব্যালট শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের উদ্দেশে একটি রাজনৈতিক বার্তা-
তোমরা শুধু অর্থনীতির চালিকা শক্তি নও, তোমরা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ।
এটি প্রবাসীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি ছিল, তা কমাতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারে।
এই উদ্যোগ সফল হলে, ভবিষ্যতে আরও এগোনোর পথ খুলে যাবে-
ই-ভোটিংয়ের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ
হাইব্রিড ভোটিং সিস্টেম
প্রবাসীদের জন্য আলাদা প্রতিনিধিত্ব কাঠামো
অর্থাৎ পোস্টাল ব্যালট হতে পারে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রথম ধাপ।
প্রবাসী ভোটাধিকার এতদিন ছিল একটি প্রশ্ন।
এবার সেটি উত্তর পেয়েছে- হ্যাঁ, প্রবাসীরাও ভোট দেবে।
কিন্তু এই উত্তরকে অর্থবহ করতে হলে দরকার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়। এটি প্রমাণ করার সুযোগ যে বাংলাদেশ সত্যিই তার সব নাগরিককে সমান চোখে দেখে।
ইতিহাসের এই নতুন অধ্যায়ে প্রবাসীরা আর দর্শক নয়, তারা অংশগ্রহণকারী।