

পরিষ্কার থাকা সুস্বাস্থ্যের অন্যতম শর্ত। এই ধারণা থেকেই প্রতিদিন একাধিকবার সাবান ব্যবহার, ভিন্ন ভিন্ন শ্যাম্পু ও বডি ওয়াশের প্রতি নির্ভরতা বেড়েছে। বাজারজুড়ে এখন অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, হোয়াইটেনিং, কুলিং কিংবা সুপার ফ্রেশ নামের নানা পণ্যের ছড়াছড়ি।
কিন্তু একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলতে হয়, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক সাবান–শ্যাম্পুর ব্যবহার ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে, যার প্রভাব এখন ক্রমশ দৃশ্যমান।
ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা
মানবত্বকের ওপর একটি স্বাভাবিক লিপিড স্তর ও উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য থাকে,
যা-
জীবাণু থেকে রক্ষা করে
ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে
সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে
কঠোর রাসায়নিকযুক্ত সাবান ও শ্যাম্পু এই স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
সাবান–শ্যাম্পুতে থাকা ক্ষতিকর উপাদান
অনেক বাণিজ্যিক পণ্যে পাওয়া যায়-
SLS / SLES (সালফেট): অতিরিক্ত ফেনা তৈরি করে, ত্বক শুষ্ক করে
প্যারাবেন: হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে
কৃত্রিম সুগন্ধি (Fragrance): অ্যালার্জি ও ত্বক জ্বালাপোড়ার কারণ
ট্রাইক্লোসান: ত্বকের উপকারী ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করে
ফরমালডিহাইড রিলিজার: দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের জন্য ক্ষতিকর
এসব উপাদান নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের ক্ষতি অনিবার্য হয়ে ওঠে।
ত্বকে কী ধরনের ক্ষতি হয়
১) শুষ্কতা ও জ্বালাপোড়া
অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে, ফলে-
ত্বক খসখসে হয়ে যায়
চুলকানি ও জ্বালাপোড়া বাড়ে
২) অ্যালার্জি ও ডার্মাটাইটিস
রাসায়নিক উপাদানের সংস্পর্শে অনেকের-
লালচে ফুসকুড়ি
চুলকানি
ফোলা বা র্যাশ
দেখা দেয়, যা পরিচিত কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস নামে।
৩) ব্রণ ও ত্বকের ভারসাম্যহীনতা
অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান অতিরিক্ত ব্যবহার করলে-
উপকারী ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়
ত্বক আরও বেশি তেল উৎপাদন করে
ব্রণ ও সংক্রমণ বাড়ে
৪) শিশু ও সংবেদনশীল ত্বকে ঝুঁকি
শিশুদের ত্বক তুলনামূলকভাবে পাতলা ও সংবেদনশীল। রাসায়নিক সাবান ও শ্যাম্পু শিশুদের ক্ষেত্রে-
একজিমা
দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা
অ্যালার্জি
বাড়িয়ে দিতে পারে।
শ্যাম্পু ও স্ক্যাল্পের সমস্যা
শ্যাম্পুতে থাকা শক্ত রাসায়নিক-
মাথার ত্বক শুষ্ক করে
খুশকি বাড়ায়
চুল পড়া ও ভঙ্গুরতা তৈরি করে
অনেক সময় ‘পরিষ্কার’ স্ক্যাল্প আসলে হয়ে ওঠে অতিরিক্ত সংবেদনশীল স্ক্যাল্প।
‘অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল’ সাবান কি সত্যিই প্রয়োজন?
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে-
প্রতিদিনের ব্যবহারে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান প্রয়োজন নেই
সাধারণ সাবান ও পরিষ্কার পানি জীবাণু দূর করতে যথেষ্ট
অতিরিক্ত অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান ত্বকের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়
সচেতন ব্যবহারের করণীয়
✔️ মাইল্ড ও pH-ব্যালান্সড পণ্য নির্বাচন
সালফেট ও প্যারাবেনমুক্ত সাবান–শ্যাম্পু
“Fragrance-free” বা “Sensitive skin” লেবেলযুক্ত পণ্য
✔️ অতিরিক্ত ব্যবহার এড়িয়ে চলুন
দিনে একাধিকবার সাবান ব্যবহারের প্রয়োজন নেই
শিশুদের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা জরুরি
✔️ ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার
সাবান ব্যবহারের পর ত্বকের আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনতে ময়েশ্চারাইজার গুরুত্বপূর্ণ।
✔️ ত্বকের সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
নিজে নিজে পণ্য পরিবর্তন না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
পরিচ্ছন্নতা অবশ্যই জরুরি, তবে অতিরিক্ত রাসায়নিক নির্ভরতা ত্বকের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং নীরব ঝুঁকি। সুগন্ধ বা ফেনার মোহ নয়, ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষাই হওয়া উচিত আমাদের অগ্রাধিকার। সচেতন ব্যবহারই পারে ত্বককে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখতে।