

বায়ুদূষণকে আমরা সাধারণত শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করি- কাশি, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা গবেষণা বলছে, বায়ুদূষণের সবচেয়ে মারাত্মক আঘাত পড়ে মানুষের হৃদ্যন্ত্রের ওপর।
একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলতে হয়, দূষিত বাতাস এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি বড় কার্ডিওভাসকুলার সংকট। প্রতিদিন আমরা যে বাতাস নিই, তা নিঃশব্দে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে, অনেক সময় কোনো আগাম লক্ষণ ছাড়াই।
বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম কণা, বিশেষ করে PM2.5 ও PM10, মানুষের শরীরের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। এগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে সরাসরি রক্তপ্রবাহে মিশে যায়।
এর ফলে শরীরে কয়েকটি মারাত্মক প্রক্রিয়া শুরু হয়-
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ (Chronic Inflammation)
রক্তনালির ভেতরের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বৃদ্ধি
রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া
এই চারটি প্রক্রিয়াই হৃদ্রোগের মূল ভিত্তি।
বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে যে হৃদ্রোগগুলো বেশি দেখা যায়-
১. হার্ট অ্যাটাক
দূষিত বাতাস রক্তনালিতে চর্বি জমার প্রক্রিয়া দ্রুত করে, যা হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
২. উচ্চ রক্তচাপ
দূষণ স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে, ফলে রক্তচাপ স্থায়ীভাবে বেড়ে যেতে পারে।
৩. স্ট্রোক
রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বৃদ্ধির ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
৪. হৃদ্যন্ত্রের ছন্দের গোলযোগ (Arrhythmia)
বিশেষ করে বয়স্ক ও হৃদ্রোগীদের ক্ষেত্রে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
সবাই দূষণের শিকার হলেও কিছু মানুষ বিশেষভাবে ঝুঁকিতে-
বয়স্ক ব্যক্তি
হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্তরা
উচ্চ রক্তচাপের রোগী
শিশু ও গর্ভবতী নারী
শহরের ব্যস্ত সড়কের আশপাশে বসবাসকারী মানুষ
বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই হৃদ্যন্ত্র দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে দূষণ ট্রিগার হিসেবে কাজ করে।
উন্নয়ন, যানবাহন, শিল্পকারখানা ও নির্মাণকাজ, সব মিলিয়ে শহুরে জীবন আমাদের অজান্তেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
অনেক সময় রোগী নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন, খাদ্যাভ্যাসও মোটামুটি ঠিক, তবুও হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। এর পেছনে অন্যতম উপেক্ষিত কারণ হলো দীর্ঘদিনের বায়ুদূষণ এক্সপোজার।
না। গবেষণায় দেখা গেছে-
দূষণের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেলে সেদিনই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের হার বাড়ে।
এমনকি কয়েক ঘণ্টার উচ্চ দূষণও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে
এটি প্রমাণ করে যে বায়ুদূষণের প্রভাব তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি, দুইই।
যদিও দূষণ পুরোপুরি ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে নয়, তবু ঝুঁকি কমানো যায়-
ব্যক্তিগত পর্যায়ে
দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে বাইরে কম যাওয়া
মাস্ক ব্যবহার (বিশেষ করে হৃদ্রোগীদের জন্য)
সকাল-সন্ধ্যার ব্যস্ত সড়কে হাঁটা এড়িয়ে চলা
ঘরের ভেতরে পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করা
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায়
হৃদ্রোগীদের নিয়মিত চেকআপ
রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ
ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন
বায়ুদূষণ একটি নিঃশব্দ হৃদ্ঘাতক। এটি এমন এক ঝুঁকি, যা ধীরে ধীরে কাজ করে এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার সময় অনেক দেরি হয়ে যায়। হৃদ্রোগ প্রতিরোধের আলোচনা যদি খাদ্য ও ব্যায়ামে সীমাবদ্ধ থাকে, আর পরিবেশ উপেক্ষিত হয়, তাহলে সেই প্রতিরোধ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
হৃদ্স্বাস্থ্য মানে শুধু ব্যক্তিগত জীবনযাপন নয়, এটি পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া মানে প্রতিদিন হৃদ্যন্ত্রের ওপর অদৃশ্য চাপ তৈরি করা।
সুস্থ হৃদ্যন্ত্রের জন্য প্রয়োজন সচেতন ব্যক্তি, দায়িত্বশীল রাষ্ট্র এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ পরিষ্কার বাতাস ছাড়া সুস্থ হৃদ্যন্ত্র কল্পনাও করা যায় না।