লো-কার্ব ডায়েটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

লো-কার্ব ডায়েট ওজন কমানোর জনপ্রিয় সমাধান, নাকি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের নীরব ঝুঁকি?
লো-কার্ব ডায়েটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
প্রকাশিত

ওজন কমানো ও দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় লো-কার্ব ডায়েট এখন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। ভাত, রুটি, আলু বা শর্করাযুক্ত খাবার কমিয়ে প্রোটিন ও চর্বিনির্ভর খাদ্য গ্রহণ, এই ধারণা অনেকের কাছে কার্যকর মনে হয়। স্বল্পমেয়াদে ওজন কমলেও প্রশ্ন থেকে যায়, দীর্ঘমেয়াদে লো-কার্ব ডায়েট শরীরের জন্য কতটা নিরাপদ?

একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলতে হয়, কোনো খাদ্যপদ্ধতির প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সময়ের পরীক্ষায়, তাৎক্ষণিক ফলাফলে নয়।

লো-কার্ব ডায়েট কী

লো-কার্ব ডায়েট বলতে দৈনন্দিন ক্যালরির একটি বড় অংশ থেকে শর্করা (কার্বোহাইড্রেট) বাদ বা কমিয়ে দেওয়া বোঝায়। সাধারণত-

  • ভাত, রুটি, চিনি, মিষ্টি সীমিত

  • প্রোটিন ও ফ্যাটের পরিমাণ বাড়ানো

এর ফলে শরীর শক্তির জন্য গ্লুকোজের বদলে চর্বি ব্যবহার করতে শুরু করে।

স্বল্পমেয়াদি উপকারিতা: কেন মানুষ আকৃষ্ট হয়

লো-কার্ব ডায়েটে প্রথম দিকে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়-

  • দ্রুত ওজন কমা

  • রক্তে শর্করা সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসা

  • ক্ষুধা কম অনুভব করা

এই ফলাফলই অনেককে দীর্ঘদিন এই ডায়েট চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করে।

দীর্ঘমেয়াদে শরীরে কী ঘটে

১. পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি

কার্বোহাইড্রেট কমাতে গিয়ে অনেকেই-

ফল

শাকসবজি

পূর্ণ শস্য

এড়িয়ে চলেন। ফলে শরীরে ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে হজম ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।

২. হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

লো-কার্ব ডায়েটে যদি-

অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট

প্রক্রিয়াজাত মাংস

থাকে, তবে তা কোলেস্টেরল বাড়িয়ে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত লো-কার্ব ডায়েট হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে।

৩. কিডনি ও লিভারের ওপর চাপ

উচ্চ প্রোটিন গ্রহণ-

কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে

লিভারের বিপাক প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে

বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই কিডনি সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।

৪. হরমোন ও মেটাবলিজমে প্রভাব

দীর্ঘদিন কার্বোহাইড্রেট কম থাকলে-

থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতা কমতে পারে

মেয়েদের মাসিক অনিয়ম দেখা দিতে পারে

বিপাকীয় হার ধীর হয়ে যেতে পারে

ফলে ওজন কমা থেমে যায় বা উল্টো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

৫. মানসিক ও আচরণগত প্রভাব

লো-কার্ব ডায়েট দীর্ঘদিন চালালে অনেকের মধ্যে দেখা যায়-

খিটখিটে মেজাজ

মনোযোগের অভাব

খাবার নিয়ে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা

এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কারা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে

  • কিশোর-কিশোরী

  • গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারী

  • বয়স্ক ব্যক্তি

  • দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা

এদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া লো-কার্ব ডায়েট গ্রহণ করা নিরাপদ নয়।

লো-কার্ব বনাম সুষম খাদ্য: বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ

বিজ্ঞানভিত্তিক পুষ্টি নীতিতে বলা হয়-

সুষম খাদ্য মানে কোনো একটি উপাদান বাদ দেওয়া নয়, বরং সঠিক অনুপাতে সব উপাদান গ্রহণ।

কার্বোহাইড্রেট শরীরের প্রধান শক্তির উৎস। একে সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে গুণগত মান উন্নত করাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি উপকারী।

নিরাপদ বিকল্প কী হতে পারে

  • পরিশোধিত কার্ব কমানো

  • পূর্ণ শস্য ও আঁশযুক্ত খাবার বেছে নেওয়া

  • প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বের ভারসাম্য রাখা

  • নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম বজায় রাখা

এগুলোই টেকসই ও স্বাস্থ্যসম্মত পথ।

বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি

লো-কার্ব ডায়েট একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়; এটি একটি খাদ্য কৌশল, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সীমিত সময়ের জন্য উপকারী হতে পারে। কিন্তু এটিকে দীর্ঘমেয়াদি জীবনধারা বানানো হলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।

স্বাস্থ্য মানে দ্রুত ফল নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্য। লো-কার্ব ডায়েট হয়তো সাময়িকভাবে ওজন কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে হলে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, সুষম ও বাস্তবসম্মত খাদ্যাভ্যাস। ট্রেন্ড নয়, শরীরের প্রয়োজনকেই হওয়া উচিত স্বাস্থ্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দু।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com