

গত এক দশকে ইউরোপ-এর রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন দৃশ্যমান, ডানপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দলগুলোর দ্রুত উত্থান। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস-সহ বিভিন্ন দেশে এই প্রবণতা আরও দৃঢ় হয়েছে।
প্রশ্নটি এখন কেন্দ্রে- এই উত্থানের পেছনে আসল চালিকাশক্তি কী? অভিবাসন সংকট, নাকি অর্থনৈতিক চাপ? নাকি এর চেয়েও জটিল কোনো সমীকরণ?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক দেশে ডানপন্থী দলগুলো-
সংসদে আসন বৃদ্ধি করেছে
সরকার গঠন বা জোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে
মূলধারার রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে
উদাহরণ হিসেবে জর্জিয়া মেলোনি-এর নেতৃত্বে ইতালিতে ডানপন্থার ক্ষমতায় আসা, কিংবা মারিন লে পেন-এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য।
২০১৫ সালের ইউরোপীয় শরণার্থী সংকট-এর পর থেকে অভিবাসন ইউরোপীয় রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ইস্যু হয়ে ওঠে।
ডানপন্থী দলগুলোর মূল বক্তব্য-
সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা
শরণার্থী প্রবেশ সীমিত করা
জাতীয় সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষা
অনেক ভোটারের কাছে অভিবাসন একটি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ফলে এই ইস্যু রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠেছে।
অভিবাসন দৃশ্যমান ইস্যু হলেও, এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে অর্থনীতি।
মূল অর্থনৈতিক কারণগুলো-
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি (Cost of Living Crisis)
জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-এর পর
কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা
মধ্যবিত্ত শ্রেণির আর্থিক চাপ
অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা সরাসরি অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে ডানপন্থী দলগুলোর দিকে ঝুঁকছে, যারা “জাতীয় অগ্রাধিকার” ও “অর্থনৈতিক সুরক্ষা”র প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
বাস্তবে এই দুই ইস্যু আলাদা নয়, বরং গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে অভিবাসীদের ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা বাড়ে। ডানপন্থী দলগুলো এই দুই ইস্যুকে একত্রে উপস্থাপন করে
“Jobs vs Migrants” বা “Resources vs Refugees” ধরনের বয়ান জনমনে প্রভাব ফেলে
ফলে অভিবাসন অনেক সময় অর্থনৈতিক অসন্তোষের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
ইতালির প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী, ডানপন্থী নেতা, জর্জা মেলোনি
ডানপন্থার উত্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংস্কৃতিক উদ্বেগ-
জাতীয় পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষা
ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবর্তনের আশঙ্কা
“আমরা বনাম তারা” মানসিকতা
এই বিষয়গুলো অনেক সময় সরাসরি বলা না হলেও ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।
ডানপন্থার উত্থানকে শুধু তাদের শক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে; বরং মূলধারার দলগুলোর দুর্বলতাও বড় কারণ-
অভিবাসন ইস্যুতে স্পষ্ট নীতি না থাকা
অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে ব্যর্থতা
সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে অবহেলা করা
এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে ডানপন্থী দলগুলো।
সোশ্যাল মিডিয়া ও বিকল্প মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো ডানপন্থী বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে।
সহজ, আবেগপ্রবণ ও সরাসরি বার্তা
ভয়ের রাজনীতি (fear politics)
তথ্য ও অপতথ্যের মিশ্রণ
এগুলো জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে।
ফরাসি ডানপন্থী রাজনীতিবিদ মারিন লা পেন
ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ-
অভিন্ন অভিবাসন নীতিতে মতভেদ
একতা বনাম জাতীয় স্বার্থের টানাপোড়েন
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন
ডানপন্থার উত্থান ইউরোপীয় সংহতির ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
এই প্রবণতা শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়-
যুক্তরাষ্ট্র-এও অনুরূপ রাজনীতি
বিশ্বজুড়ে জাতীয়তাবাদী প্রবণতা বৃদ্ধি
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অনিশ্চয়তা
ফলে এটি একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ।
জার্মান উগ্র-ডানপন্থী দল, এএফডি নেতা রবার্ট সেসেলমান
ইউরোপের সামনে এখন কয়েকটি সম্ভাব্য পথ-
1. ডানপন্থার আরও শক্তিশালী উত্থান
2. মূলধারার দলগুলোর নীতিগত সংস্কার
3. অভিবাসন ও অর্থনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান
কোন পথটি বেছে নেওয়া হবে, তা নির্ভর করছে ভোটারদের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর।
স্পেনের ভক্স পার্টির নেতা সান্টিয়াগো আবাস্কাল
ইউরোপে ডানপন্থার উত্থানকে শুধুমাত্র অভিবাসন বা অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। এটি একটি বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া, যেখানে অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন ইস্যু, সাংস্কৃতিক উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতা, সবকিছু মিলেই কাজ করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তন সাময়িক নয়; বরং এটি ইউরোপীয় রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।