

আর্কটিক অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার (৫ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউস জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের লক্ষ্যে সামরিক বাহিনীসহ একাধিক সম্ভাব্য বিকল্প বিবেচনা করছেন।
ডেনমার্ক এই অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছে। দেশটি সতর্ক করে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো একতরফা সামরিক পদক্ষেপ ন্যাটো জোটের ঐক্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ এবং আর্কটিকের একটি কৌশলগত কেলেঙ্কারি। এটি শুধুমাত্র ভূরাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়—প্রাকৃতিক সম্পদ, নতুন বাণিজ্য রুট, সামরিক নজরদারি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার কারণে বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু।
তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস: আর্কটিকের গলে ওঠা বরফ নতুন তেল ও গ্যাসক্ষেত্র উন্মুক্ত করছে, যা বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
খনিজ সম্পদ: রার আর্থ উপাদান ও অন্যান্য মহামূল্যবান খনিজ পদার্থ রয়েছে, যা প্রযুক্তি ও শক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ।
সামরিক ও কৌশলগত সুবিধা: যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক অঞ্চলে রকেট পরীক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র নজরদারি ও সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে গ্রিনল্যান্ডকে স্ট্র্যাটেজিক হিসেবে দেখছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং চীন–রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় এই দ্বীপের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আর্কটিক অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষদের প্রভাব সীমিত করা জরুরি।
“প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন—গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার। আর্কটিক অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কার্যক্রম মোকাবিলা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি শুধু ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়—বাণিজ্যিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতারও অংশ, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নতুন শিপিং রুট ও সম্পদ উপার্জনের সুযোগ যুক্ত হয়েছে।
ডেনমার্ক সতর্ক করে বলেছে, কোনো একতরফা সামরিক পদক্ষেপ ন্যাটো জোটের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তারা জোর দিয়েছেন—গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দ্বীপবাসীর মতামত ও আন্তর্জাতিক আইনের শর্তাবলী মেনে চলা প্রয়োজন।
ন্যাটো বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি চূড়ান্তভাবে সামরিক বিকল্প বিবেচনা করে, তাহলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ ও নৌপথ নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
চীন: বেইজিং আর্কটিক অঞ্চলে বাণিজ্য ও গবেষণায় ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন শিপিং রুটে অংশ নেওয়ার জন্য চীন কৌশলগতভাবে সক্রিয়।
রাশিয়া: মস্কো আর্কটিকের সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করছে, যা ন্যাটো ও আন্তর্জাতিক আইনকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের সম্ভাব্য সামরিক বিকল্পগুলি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলের সঙ্গে যুক্ত, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায়।
অর্থনৈতিক দিক থেকে, দ্বীপে প্রাকৃতিক সম্পদ ও নতুন বাণিজ্য পথকে নিয়ন্ত্রণ করার মানে হল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন—সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলে কূটনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকি বাড়বে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কৌশলগত অগ্রাধিকার, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে দ্বীপবাসী, আন্তর্জাতিক আইন এবং ন্যাটোর উদ্বেগকে উপেক্ষা করলে এটি বৃহৎ কূটনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।