জলবায়ু কূটনীতি: প্রতিশ্রুতি বেশি, বাস্তব পদক্ষেপ কম কেন?

জলবায়ু কূটনীতি: প্রতিশ্রুতি বেশি, বাস্তব পদক্ষেপ কম কেন?
প্রকাশিত

একসময় জলবায়ু পরিবর্তনকে মূলত পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন, অভিবাসন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; বরং বর্তমানের বাস্তবতা।

এই বাস্তবতা মোকাবিলায় বিশ্বনেতারা নিয়মিত জলবায়ু সম্মেলনে মিলিত হন, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেন এবং শত শত প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি এত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ এখনো কেন উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ? কেন জলবায়ু ঝুঁকি কমার বদলে বাড়ছে? জলবায়ু কূটনীতি কি বাস্তব পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হচ্ছে?

জলবায়ু কূটনীতি আসলে কী?

জলবায়ু কূটনীতি হলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা, চুক্তি এবং সহযোগিতার প্রক্রিয়া।

এর প্রধান উদ্দেশ্য-

* গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো

* নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি

* জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়া

* অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা

কিন্তু সমস্যা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট হলেও এর কারণ, দায় এবং প্রভাব সব দেশে সমান নয়।

প্রতিশ্রুতির ইতিহাস: চুক্তি আছে, অগ্রগতি সীমিত

বিশ্ব জলবায়ু রাজনীতিতে কয়েকটি বড় মাইলফলক রয়েছে-

* কিয়োটো প্রটোকল

* প্যারিস চুক্তি

* জাতিসংঘের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলন (COP)

বিশেষ করে প্যারিস চুক্তিতে দেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে এবং সম্ভব হলে ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়।

কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ দেশ এখনো সেই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে নেই।

কেন প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে এত বড় ব্যবধান?

১. জাতীয় স্বার্থ বনাম বৈশ্বিক স্বার্থ

জলবায়ু কূটনীতির সবচেয়ে বড় বাধা হলো জাতীয় স্বার্থ।

প্রতিটি দেশ চায়-

* অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

* শিল্পায়ন

* কর্মসংস্থান বৃদ্ধি

অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমানো অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়ায়।

ফলে, সরকারগুলো প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত লক্ষ্যকে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কাছে পিছিয়ে দেয়।

২. উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের দ্বন্দ্ব

এটি জলবায়ু আলোচনার সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর যুক্তি- শিল্প বিপ্লবের পর থেকে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে উন্নত দেশগুলো।

ফলে ঐতিহাসিক দায় তাদের বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের দায়িত্বও তাদের হওয়া উচিত।

অন্যদিকে উন্নত দেশগুলো চায় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোও সমানভাবে নির্গমন কমানোর দায়িত্ব নিক।

এই বিরোধ প্রায় প্রতিটি জলবায়ু সম্মেলনেই দেখা যায়।

৩. অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সংকট

বহু বছর ধরে উন্নত দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে।

কিন্তু বাস্তবে-

* অর্থ ছাড়ে বিলম্ব

* প্রতিশ্রুত অর্থের ঘাটতি

* ঋণ বনাম অনুদান বিতর্ক

এসব কারণে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পায় না।

ফলে আস্থা সংকট তৈরি হয়।

৪. জীবাশ্ম জ্বালানির শক্তিশালী প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি হলেও-

* তেল

* গ্যাস

* কয়লা

এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অনেক দেশের অর্থনীতি সরাসরি এসব খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে রাজনৈতিকভাবে দ্রুত পরিবর্তন আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

জ্বালানি নিরাপত্তা বনাম জলবায়ু প্রতিশ্রুতি

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ- এর পর বহু দেশ জ্বালানি নিরাপত্তাকে জলবায়ু লক্ষ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ফলাফল-

* কিছু দেশে কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি

* নতুন গ্যাস প্রকল্প

* জীবাশ্ম জ্বালানিতে পুনর্বিনিয়োগ

এটি দেখিয়েছে যে সংকটের সময়ে অনেক দেশ পরিবেশের চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়।

জলবায়ু কূটনীতিতে ভূরাজনীতির প্রভাব

জলবায়ু আলোচনা এখন আর শুধুমাত্র পরিবেশগত বিষয় নয়। এটি ক্রমশ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এবং বৃহৎ কার্বন নির্গমনকারী। তাদের সহযোগিতা ছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় জলবায়ু সহযোগিতাকেও প্রভাবিত করে।

COP সম্মেলন: সাফল্য না প্রতীকী রাজনীতি?

প্রতিবছর COP সম্মেলনে-

* নতুন প্রতিশ্রুতি

* উচ্চপর্যায়ের ভাষণ

* বড় ঘোষণা

দেখা যায়।

সমালোচকদের মতে-

অনেক ক্ষেত্রে এসব সম্মেলন বাস্তব পদক্ষেপের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা ও কূটনৈতিক প্রদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

তবে সমর্থকদের যুক্তি হলো-

এই প্ল্যাটফর্ম না থাকলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও দুর্বল হয়ে যেত। সত্য সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও।

ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বাস্তবতা: সবচেয়ে কম দায়, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো-

যেসব দেশ সবচেয়ে কম দূষণ করেছে, তারাই প্রায়শই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

এর মধ্যে রয়েছে

* ছোট দ্বীপরাষ্ট্র

* আফ্রিকার অনেক দেশ

* দক্ষিণ এশিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল

বাংলাদেশ এই বাস্তবতার অন্যতম উদাহরণ।

ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা এবং জলবায়ু অভিবাসন দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

সবুজ অর্থনীতির প্রতিযোগিতা: নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে

জলবায়ু কূটনীতির একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে-

* নবায়নযোগ্য জ্বালানি

* বৈদ্যুতিক যানবাহন

* সবুজ প্রযুক্তি

* কার্বনমুক্ত শিল্প

নিয়ে নতুন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

অনেক দেশ জলবায়ু সংকটকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে।

জলবায়ু কূটনীতি কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ?

সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জলবায়ু কূটনীতি অপরিহার্য।

কারণ-

* কোনো দেশ একা এই সংকট সমাধান করতে পারবে না

* জলবায়ু পরিবর্তন সীমান্ত মানে না

* আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া অভিযোজন ও অর্থায়ন সম্ভব নয়

অর্থাৎ, বর্তমান ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলেও এর বিকল্প আরও দুর্বল।

ভবিষ্যৎ: প্রতিশ্রুতির যুগ থেকে বাস্তবায়নের যুগে?

আগামী দশকে জলবায়ু কূটনীতির সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর-

১. প্রতিশ্রুতিকে আইনি ও নীতিগত বাস্তবতায় রূপ দেওয়া

২. উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা

৩. জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা

জলবায়ু কূটনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রতিশ্রুতির অভাব নয়; বরং বাস্তবায়নের ঘাটতি।

বিশ্বনেতারা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সচেতন। চুক্তিও আছে, লক্ষ্যও আছে, পরিকল্পনাও আছে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সেই লক্ষ্যগুলো প্রায়ই বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ নেয় না।

ফলে জলবায়ু কূটনীতির মূল প্রশ্ন আজ আর “কী করা উচিত” নয়; বরং “যা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবে কতটা করা হচ্ছে?”।

এবং এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের পৃথিবী কতটা বাসযোগ্য থাকবে।

logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com