

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর শুধু ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলা, প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা এবং হরমুজ প্রণালিসহ সমুদ্রপথে জ্বালানি রুটের নিরাপত্তা ঘিরে উদ্বেগ, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অনেক বিশ্লেষকই ‘অল-আউট ওয়ার’ বা সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান সরাসরি বড় শক্তির সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে চায় না। বরং তারা ‘প্রক্সি কৌশল’ ব্যবহার করে আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে চায়। আর চলমান সংঘাতেও এই কৌশলের মাধ্যমেই তেহরান নিজে সব ফ্রন্টে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়েও প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাক-সিরিয়ায় সক্রিয় শিয়া মিলিশিয়াগুলো সাম্প্রতিক সময়গুলোতে আরও সমন্বিতভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্সি নেটওয়ার্কই এখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মূল চালিকাশক্তি। মূলত এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের একটি অঞ্চলে উত্তেজনা তৈরি হলে তা দ্রুত অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে যুদ্ধের ক্ষেত্র আর সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানকে নিজের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে ইসরায়েল, বিশেষ করে তেহরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব বজায় রাখা এবং মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওয়াশিংটন বর্তমানে ‘কনটেইনমেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ বা নিয়ন্ত্রণমূলক কৌশল অনুসরণ করছে। অর্থাৎ, সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না গিয়ে ইরানের প্রভাব সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে- চলমান সংঘাতে প্রতিটি পাল্টা হামলা তথা পদক্ষেপই নতুন করে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। আর এটিই এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক উদ্বেগ
ইরানকে ঘিরে চলমান এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই রুটে কোনও ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। সংঘাতের জেরে ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে তেল ও জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যহত হয়েছে।
সংঘাত বিশ্লেষণভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ আগেই সতর্ক করে বলেছিল, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হলে তা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। এতে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং জবাবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের পাল্টা হামলা ও হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত করার কারণে ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে অস্থিতরতা দেখা দিয়েছে। চলমান এই সংঘাতের একমাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল শনিবার (২৮ মার্চ)।
এদিনই বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল কুয়েতি তেলের দাম এক লাফে ১১৮ ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা। কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, কুয়েতি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮.১০ ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ১১৮.৯৩ ডলারে পৌঁছেছে। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মূলত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণেই সারা বিশ্বে তেলের বাজারে বিরাজ করছে অস্থিরতা। ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি আক্রমণ অথবা আক্রমণের হুমকির মুখে এই সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে।
বিশ্বব্যাপী মোট জ্বালানি রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। আর তাই এটি বৈশ্বিক গ্যাস ও তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং হরমুজ প্রণালি অনিরাপদ হয়ে ওঠায় সামনের দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
যুদ্ধে আরও কারা জড়াতে পারে?
সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে এটি শুধু ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, এমনকি রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব একদিকে ইরানের প্রভাব মোকাবিলা করতে চায়, অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি এড়াতে চায়। একইভাবে তুরস্ক আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করতে চাইছে।
ফলে একটি জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এখানে আঞ্চলিক দেশ এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর যেকোনও ভুল সিদ্ধান্ত বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা বললেও কার্যকর তেমন কোনও পদক্ষেপ না নেয়ায় ভবিষ্যতে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত রূপ নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘কনটেইনমেন্ট বনাম এস্কেলেশন’ দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছেন। একদিকে শক্তিধর বড় দেশগুলো সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, অন্যদিকে বাস্তবে হামলা-পাল্টা হামলা কমার কোনও লক্ষণ নেই। এতে করে মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতিটি হামলা ও পাল্টা হামলা এই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করছে। ফলে কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে?
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এক ধরনের ‘কন্ট্রোলড ক্যাওস’ তথা যেখানে কেউই সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ সেই দিকেই এগোচ্ছে। ছোট ছোট সংঘাত, প্রক্সি যুদ্ধ এবং ধারাবাহিক উত্তেজনা, সব মিলিয়ে আরও বিস্তৃত ও বড় সংঘাতের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এই উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে, নাকি তা আরও বিস্তৃত হয়ে আরেকটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। আর তা হচ্ছে— ইরানকে ঘিরে এই সংঘাত কেবল একটি দেশের সঙ্গে অন্য এক-দুটি দেশের লড়াই নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের লড়াই। আর এর প্রভাব বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পড়বে অবশ্যম্ভাবীভাবে। একইসঙ্গে এই সংঘাতের ফলাফলও হবে সুদূরপ্রসারী।