আফগানিস্তানে নারীর শিক্ষার দূরাবস্থা: বিশ্ব কেন নীরব?

আফগানিস্তানে নারীর শিক্ষার দূরাবস্থা: বিশ্ব কেন নীরব?
প্রকাশিত

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রতিযোগিতা আর ডিজিটাল বিপ্লব নিয়ে বিশ্ব ব্যস্ত, ঠিক তখনই আফগানিস্তানে একটি গোটা প্রজন্মের মেয়েদের কলম কেড়ে নেওয়া হয়েছে। স্কুলের দরজা বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয় নিষিদ্ধ, জ্ঞান অর্জনের পথ রুদ্ধ, নারীর শিক্ষা আজ সেখানে অপরাধের মতো বিবেচিত। প্রশ্ন হলো, এই সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামনে বিশ্ব কেন এত নীরব?

এই নীরবতা শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি বৈশ্বিক বিবেকের এক গভীর সংকট।

তালেবান শাসনে শিক্ষার অন্ধকার অধ্যায়

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই আফগানিস্তানে নারীর জীবনে নেমে আসে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা। মাধ্যমিক শিক্ষার দরজা প্রথমে বন্ধ হয়, এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষাও নারীদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মেয়েদের উপস্থিতিকে ‘অইসলামিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়, যে ব্যাখ্যার সঙ্গে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা বা ইতিহাসের কোনো সামঞ্জস্য নেই।

শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে কেবল শ্রেণিকক্ষ হারানো নয়; এর অর্থ একটি জাতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পিতভাবে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া।

তবে সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে, আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ‘আমর বিল মা’আরুফ, ওয়াননাহয়ি আনিল মুনকার’ (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ)–এর মুখপাত্র সাইফুল ইসলাম খাইবার বলেন, 

ব্যাপারটা এ রকম নয় যে, পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটা একধরনের সাময়িক বিরতিতে আছে। বিষয়টা এ রকম নয় যে ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে কেউ স্কুলে যেতে পারবে না বা মেয়েরা যেতে পারবে না। এটা ঠিক নয়। হয়তো এক মাস পর (স্কুল) খুলে যাবে, হয়তো এক বছর পর খুলবে বা দুই বছর পর। কিন্তু খুলবে।

বৈশ্বিক নীরবতার পেছনের রাজনীতি

এ বিষয়ে বিশ্বের নীরবতা হঠাৎ বা কাকতালীয় নয়। এর পেছনে রয়েছে কঠোর বাস্তববাদী রাজনীতি। আফগানিস্তান এখন আর বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নেই। পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি নিয়ে দেশটি থেকে সরে গেছে। নতুন করে চাপ সৃষ্টি মানে আবারও জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি, যা কেউ নিতে চায় না।

অন্যদিকে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো আফগানিস্তানকে নিরাপত্তা, অভিবাসন ও সন্ত্রাসবাদ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে; নারী শিক্ষার প্রশ্ন সেখানে প্রায় গৌণ। ফলে মানবাধিকার নীতির জায়গা দখল করে নেয় কৌশলগত স্বার্থ।

মানবাধিকার বনাম স্বার্থের দ্বন্দ্ব

আফগান নারীদের শিক্ষা বন্ধ হওয়া একটি স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মানবাধিকার আলোচনার টেবিলে জায়গা পায় তখনই, যখন তা শক্তির স্বার্থের সঙ্গে মেলে।

আজকের বাস্তবতায় আফগানিস্তানকে ঘিরে বিশ্বশক্তিগুলোর প্রধান লক্ষ্য হলো- স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ। এই সমীকরণে আফগান নারীদের ভবিষ্যৎ একটি নীরব দরকষাকষির শিকার।

একটি হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম

সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতিটা হচ্ছে সামাজিক ও মানসিক স্তরে। স্কুলে যেতে না পারা মেয়েরা শুধু শিক্ষাবঞ্চিত নয়, তারা আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা হারাচ্ছে। অল্প বয়সে বিয়ে, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তাদের ভবিষ্যৎকে সংকুচিত করে দিচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদে এটি আফগান সমাজকে আরও পিছিয়ে দেবে। শিক্ষাহীন নারীর মানে শিক্ষাহীন পরিবার, আর শিক্ষাহীন পরিবার মানেই একটি দুর্বল রাষ্ট্র।

ধর্মীয় দোহাই দিয়ে নিষেধাজ্ঞা: 

তালেবান তাদের সিদ্ধান্তকে ধর্মীয় বৈধতার মোড়কে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে নারী ছিলেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও চিন্তাবিদ। ধর্মকে ব্যবহার করে নারীর অধিকার খর্ব করা আসলে ক্ষমতা ধরে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল।

এই বাস্তবতা জেনেও বিশ্ব মুসলিম নেতৃত্বের বড় অংশ নীরব, যা আরও হতাশাজনক।

বিশ্ব কী করতে পারত, কিন্তু করছে না

আফগানিস্তানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক স্বীকৃতির শর্ত আরোপ, আন্তর্জাতিক ফোরামে একক ও সমন্বিত অবস্থান, এমন অনেক পথই খোলা ছিল। কিন্তু সেসবের কোনোটিই দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

বিক্ষিপ্ত বিবৃতি, উদ্বেগ প্রকাশ আর প্রতীকী নিন্দা, এসব দিয়ে কোনো শাসনব্যবস্থার নীতিতে পরিবর্তন আসে না।

তবে, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করেছিল, তখন তাদের অন্যতম দাবি ছিল দেশটিতে নারীদের স্বাধীনতা। গত কয়েক বছরে আফগানিস্তানের সঙ্গে পশ্চিমাদের সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে নারী স্বাধীনতার বিষয়টি ঘুরেফিরে এসেছে। যেমন, ২০২২ সালের মার্চে কাতারে তালেবানের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, প্রাথমিকের পর নারীদের পড়াশোনা করতে না দেওয়ার কারণেই বৈঠক বাতিল করা হলো। ২০২৪ সালের জুন মাসে তালেবানের ভাষ্য ছিল, নারী স্বাধীনতা ‘আফগানিস্তানের বিষয়’। অর্থাৎ এ বিষয়ে অন্য দেশের পরামর্শ তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

নীরবতার মূল্য কে দেবে?

এই নীরবতার মূল্য দিচ্ছে আফগান মেয়েরা, যাদের অপরাধ শুধু তারা মেয়ে হয়ে জন্মেছে। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এই দায় শুধু তালেবানের নয়; দায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থারও, যারা মানবাধিকারের ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু প্রয়োগে দ্বিধাগ্রস্ত।

শেষ প্রশ্ন

আফগানিস্তানে নারীর শিক্ষা নিষিদ্ধ হওয়া কোনো ‘আভ্যন্তরীণ বিষয়’ নয়; এটি মানব সভ্যতার জন্য একটি সতর্কবার্তা। আজ যদি এই অবিচারের বিরুদ্ধে বিশ্ব নীরব থাকে, আগামীকাল অন্য কোথাও একই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা আরও সহজ হয়ে যাবে।

প্রশ্ন তাই একটাই- বিশ্ব কি সত্যিই নারীর শিক্ষা ও অধিকারকে সর্বজনীন মূল্যবোধ মনে করে, নাকি তা কেবল সুবিধাজনক সময়ের স্লোগান?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আফগানিস্তানের মেয়েরা ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজন্ম হবে, নাকি মানব বিবেকের জাগরণের

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com