

ইরান আবার উত্তাল। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে প্রাদেশিক শহর, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে শ্রমিক মহল্লা, সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিবাদ নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জমে থাকা দ্বন্দ্বের প্রকাশ।
এই আন্দোলন প্রশ্ন তুলছে শুধু সরকারের নীতির বিরুদ্ধে নয়, বরং ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার ওপর।
ইরানে আগেও বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু এবারের আন্দোলনকে আলাদা করে দেখার কারণ আছে-
এটি দাবিনির্ভর নয়, অস্তিত্বমূলক
এটি কেবল সংস্কার নয়, ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করছে
এটি ভয়কে অতিক্রম করে মনস্তাত্ত্বিক সীমা ভেঙে দিয়েছে
এ কারণেই এই আন্দোলন শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বাহ্যিকভাবে আন্দোলনের পেছনে অর্থনৈতিক সংকট বড় কারণ হলেও, প্রকৃত সংকট আরও গভীরে-
১. অর্থনৈতিক অবরুদ্ধতা
দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট সাধারণ মানুষকে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। জীবনধারণের প্রশ্নে মানুষ এখন আর ধৈর্য ধরতে পারছে না।
২. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দমন
ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারীর অধিকার, মতপ্রকাশ, এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে।
৩. রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট
নির্বাচন থাকলেও বাস্তব ক্ষমতা সীমিত প্রতিষ্ঠানের হাতে,
এই উপলব্ধি মানুষকে রাষ্ট্র থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করছে।
মূলত এই ৩ ইস্যুর সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশই, ক্ষোভের আন্দোলন থেকে অবাধ্যতার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো-
এটি ভয়মুক্ত
নারীরা সামনের সারিতে
তরুণরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় প্রতীককে চ্যালেঞ্জ করছে
শহুরে মধ্যবিত্তের পাশাপাশি শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যুক্ত হচ্ছে
ইতিহাস বলে, যখন জনগণ ভয় হারায়, তখন রাষ্ট্র শুধু শক্তি দিয়ে টিকে থাকতে পারে না। কারণ শাসনের ভিত্তিই তখন নড়বড়ে হয়ে যায়।
ইরানি রাষ্ট্র বরাবরই কঠোর। নিরাপত্তা বাহিনী, গ্রেপ্তার, তথ্য নিয়ন্ত্রণসব ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এবার রাষ্ট্র এক ধরনের কৌশলগত সংকটে পড়েছে-
বেশি দমন করলে আন্দোলন আরও উগ্র হচ্ছে
কম দমন করলে শাসনের কর্তৃত্ব দুর্বল দেখাচ্ছে
এই দ্বিধা ইঙ্গিত দেয়- রাষ্ট্রও বুঝছে, এটি আর সাধারণ বিক্ষোভ নয়।
ইরান কেবল একটি দেশ নয়; এটি একটি আঞ্চলিক শক্তি।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরাশক্তি ইরান। তাই, ইরানের অস্থিরতা মানে বিশ্বমহলের জন্য উত্তপ্ত বিষয়। ইরানের নড়বড়ে পরিস্থিতিতে যেসব বৈশ্বিক পয়েন্ট আলোচিত:
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দুর্বলতা → আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস
পশ্চিমা বিশ্ব → মানবাধিকার ও নিষেধাজ্ঞার নতুন চাপ
রাশিয়া ও চীন → কৌশলগত মিত্র হলেও অস্থিরতা তাদের হিসাব জটিল করছে
বিশ্ব প্রকাশ্যে খুব বেশি কিছু না বললেও, নীরবে সবাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে,
কারণ ইরানের ভেতরের পরিবর্তন বাইরের শক্তির সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
এটাই সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন।
বাস্তবতা হলো-
স্বল্পমেয়াদে শাসন পতনের সম্ভাবনা কম
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই আন্দোলন শাসনের চরিত্র বদলে দিতে পারে
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন, রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক আর আগের মতো নেই
এটি হয়তো আজ থামবে, কিন্তু এর রেখে যাওয়া প্রশ্ন, ক্ষত ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আর মুছে যাবে না।
ইরানের আন্দোলন বিশ্বকে একটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়-
আদর্শ দিয়ে শাসন টিকে না, যদি জীবনের বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়
নিরাপত্তা দিয়ে নীরবতা আনা যায়, সম্মতি নয়
তরুণ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না
ইরান আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
এই আন্দোলন হয়তো এখনই শাসন বদলাবে না, কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবে বলছে, পুরোনো চুক্তি ভেঙে গেছে, নতুন কিছু আসছে।
প্রশ্ন শুধু একটাই:
সেই পরিবর্তন হবে শান্ত সংস্কারের মাধ্যমে, নাকি দীর্ঘ ও অস্থির লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে?