

দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মতাদর্শিক বিভাজনে চিহ্নিত মধ্যপ্রাচ্য এখন এক নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। যেখানে গতকালকার শত্রু আজ আলোচনার টেবিলে, আর দীর্ঘদিনের অঘোষিত সহযোগিতা কখনো প্রকাশ্যে আসছে, কখনো আবার থমকে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে সৌদি আরব-ইরান সম্পর্কের উষ্ণতা এবং ইসরায়েল-কে ঘিরে নতুন সমীকরণ।
২০২৩ সালে চীন-এর মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ঘোষণা আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় মোড় ঘুরিয়েছে।
পটভূমি:
সুন্নি বনাম শিয়া ভূরাজনীতি
ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, বিভিন্ন প্রক্সি সংঘাত
আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতা
বর্তমান বাস্তবতা:
দূতাবাস পুনরায় চালু
নিরাপত্তা সংলাপ শুরু
উত্তেজনা হ্রাসের চেষ্টা
তবে এটি স্থায়ী শান্তি নয়; বরং “managed rivalry”. অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন জোট রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসরায়েল।
আরব-ইসরায়েল সম্পর্কের পরিবর্তন
আব্রাহাম চুক্তি-এর মাধ্যমে
সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি
নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা
সৌদি-ইসরায়েল সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক স্থাপন না করলেও-
গোপন বা সীমিত যোগাযোগ রয়েছেমার্কিন মধ্যস্থতায় আলোচনা হয়েছে
কিন্তু গাজা উপত্যকা-কেন্দ্রিক সংঘাত এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে “axis of resistance” গড়ে তুলেছে-
লেবাননে হিজবুল্লাহ
ইয়েমেনে হুথি
ইরাক ও সিরিয়ায় প্রভাব
সৌদি আরবের সাথে সমঝোতা সত্ত্বেও ইরান তার এই নেটওয়ার্ক ধরে রেখেছে, যা তাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান দেয়।
তুরস্ক ও কাতার নিজেদেরকে “bridge player” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে-
দ্বন্দ্বপূর্ণ পক্ষগুলোর সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা
কূটনৈতিক মধ্যস্থতা
অর্থনৈতিক বিনিয়োগ
এই দেশগুলো বহুমুখী সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান শক্তি হিসেবে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে-
আঞ্চলিক দেশগুলোর বহুমুখী কূটনীতি
চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্র এখন আর একক প্রভাবশালী শক্তি নয়; বরং একটি “contested influence” পরিবেশে কাজ করছে।
চীন-এর ভূমিকা এই নতুন সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-
সৌদি-ইরান চুক্তির মধ্যস্থতা
জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক
“non-interference” নীতির মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা
চীন নিজেকে একটি বিকল্প কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের জোট রাজনীতির পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি জ্বালানি-
তেল ও গ্যাস রপ্তানি
বাজার নিয়ন্ত্রণ
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব
সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো এখন জ্বালানির পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য (Economic diversification) নিয়েও কাজ করছে।
গাজা উপত্যকা-কে ঘিরে সংঘাত নতুন জোট রাজনীতিকে ধীর করেছে-
আরব জনমতের চাপ বৃদ্ধি
ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণে বাধা
ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা
এটি দেখায় যে, একটি সংঘাত পুরো অঞ্চলের কূটনৈতিক অগ্রগতি প্রভাবিত করতে পারে।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যে দেশগুলো আর একক জোটে আবদ্ধ নয়।
নতুন বৈশিষ্ট্য-
এক দেশের সাথে নিরাপত্তা, অন্য দেশের সাথে বাণিজ্য
প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখা
বাস্তববাদী (pragmatic) কূটনীতি
এটি “multi-alignment” বা বহুমুখী জোট রাজনীতির উদাহরণ।
ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা
এই নতুন সমীকরণ যতটা সুযোগ তৈরি করছে, ততটাই ঝুঁকিও-
ভুল বোঝাবুঝি থেকে দ্রুত সংঘাতের সম্ভাবনা
প্রক্সি যুদ্ধের পুনরুত্থান
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা
অর্থাৎ, স্থিতিশীলতা এখনো ভঙ্গুর।
মধ্যপ্রাচ্যের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ-
1. দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভারসাম্য
2. নতুন সংঘাতের ঢেউ
3. অর্থনৈতিক সহযোগিতাভিত্তিক স্থিতিশীলতা
কোনটি বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন জোট রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়-
এখানে আদর্শিক বিভাজনের জায়গায় ধীরে ধীরে বাস্তববাদী স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে।
“পুরোনো শত্রু, নতুন বন্ধু”, এই বাক্যটি পুরোপুরি সত্য না হলেও, এটুকু নিশ্চিত যে সম্পর্কগুলো এখন আগের মতো সরল নয়। বরং এটি একটি জটিল, বহুস্তরীয় এবং পরিবর্তনশীল কূটনৈতিক বাস্তবতা, যা আগামী দশকে বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক হয়ে উঠবে।