

রিয়াদ–ইসলামাবাদ ঘনিষ্ঠতায় গড়ে ওঠা সম্ভাব্য পাকিস্তান-সৌদি সামরিক জোটে তুরস্ক থাকছে না—এমন ইঙ্গিত মিলছে আঞ্চলিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হলেও আঙ্কারা এই জোট থেকে সচেতনভাবেই দূরত্ব বজায় রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তুরস্কের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রে রয়েছে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (strategic autonomy)। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে এমন কোনো সামরিক জোটে সরাসরি যুক্ত হতে আগ্রহী নয়, যা তাকে নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ব্লকে আবদ্ধ করে ফেলে। পাকিস্তান-সৌদি ঘনিষ্ঠতা যদিও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা বিনিময়ের মধ্যে সীমিত থাকার কথা বলা হচ্ছে, তবু এটি ইরান-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক উত্তেজনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে—যা তুরস্ক এড়িয়ে চলতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-তুরস্ক সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও তা সম্পূর্ণ বৈরী নয়। সিরিয়া, ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের নিজস্ব নিরাপত্তা হিসাব আছে। ফলে সৌদি-কেন্দ্রিক কোনো সামরিক কাঠামোয় যুক্ত হলে আঙ্কারার কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নতুন নয়। পাকিস্তানি সেনা প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া এবং নিরাপত্তা পরামর্শের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বহু দশকের। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেন যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা ও উপসাগরীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ক আরও দৃশ্যমান হয়েছে। তবে রিয়াদ ও ইসলামাবাদ—উভয়ই আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট না বলে “প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার” হিসেবেই তুলে ধরছে।
তুরস্ক জোটে না থাকলেও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সামরিক সম্পর্ক অটুট। নৌবাহিনী ও বিমান প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ প্রকল্প, ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ, তুরস্ক কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে বহুমুখী অংশীদারত্ব বজায় রাখার কৌশল নিচ্ছে।
তুরস্কের এই দূরত্ব বার্তা দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যে একটি একক সামরিক ব্লক গড়ে ওঠার পথে এখনও ভূরাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সৌদি-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা যেখানে নিরাপত্তা উদ্বেগে চালিত, সেখানে তুরস্ক তার প্রভাব বিস্তার করছে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা শিল্প ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আঙ্কারার অবস্থান ভবিষ্যতে ইরান-সৌদি সম্পর্কের ওঠানামা এবং গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধপরবর্তী আঞ্চলিক বিন্যাসের ওপরও নির্ভর করবে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তুরস্ক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে—সে কোনো নতুন সামরিক মেরুকরণে যুক্ত হতে চায় না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পাকিস্তান-সৌদি সামরিক বোঝাপড়া জোরালো হলেও তাতে তুরস্কের অনুপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল শক্তির ভারসাম্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। আঙ্কারা জোটের বাইরে থেকেই নিজস্ব কৌশলগত পথ অনুসরণ করবে—এটাই আপাতত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট।