

দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে পরিচিত। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অধিকাংশ সময় পরিচালিত হয়েছে ছায়াযুদ্ধ, গোয়েন্দা অভিযান, সাইবার হামলা এবং প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে। সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে দুই দেশ সরাসরি সামরিক মোকাবিলার ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এই সংঘাত কি দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে জড়িয়ে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু তেহরান ও তেল আবিবের দিকে তাকালে হবে না; দেখতে হবে লেবানন, সিরিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল, সমুদ্রপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থানকেও।
দশকের পর দশক ধরে ইরান ও ইসরায়েল পরস্পরকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে।
* ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার
* ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি
* পারমাণবিক কর্মসূচি
* ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী
নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।
* ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র
* পশ্চিমা প্রভাবের প্রতীক
* ফিলিস্তিন প্রশ্নে প্রধান প্রতিপক্ষ
ফলে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই শত্রুতাপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও প্রকাশ্য ও প্রত্যক্ষ করে তুলেছে।
যদি আঞ্চলিক যুদ্ধের সম্ভাব্য কেন্দ্রগুলোর তালিকা করা হয়, তাহলে প্রথমেই আসবে লেবানন।
কারণ এখানে রয়েছে হিজবুল্লাহ, যাকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সামরিক সংগঠনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
* হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে
* সংগঠনটির সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে
* ইসরায়েলের উত্তর সীমান্ত সরাসরি ঝুঁকির মুখে
যদি পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু হয়, তাহলে লেবানন সম্ভবত দ্বিতীয় প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
এমন পরিস্থিতি শুধু লেবাননের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সিরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও ইসরায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
সিরিয়ায়-
* ইরানের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে
* ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী সক্রিয়
* রাশিয়ারও কৌশলগত অবস্থান রয়েছে
ইসরায়েল নিয়মিতভাবে সিরিয়ার বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে, যেগুলোকে তারা ইরান-সম্পর্কিত সামরিক স্থাপনা বলে দাবি করে।
ফলে সিরিয়া এমন একটি অঞ্চল, যেখানে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র বর্তমানে অত্যন্ত জটিল অবস্থানে রয়েছে।
একদিকে- তারা ইরানের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন
অন্যদিকে- বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধ তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে
বিশেষ করে তেল রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বড় ঝুঁকি।
ফলে অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশ বর্তমানে সরাসরি পক্ষ না নিয়ে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী।
মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বড় সংঘাতের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-কে বাদ দেওয়া যায় না।
অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের-
* সামরিক ঘাঁটি
* নৌবাহিনীর উপস্থিতি
* নিরাপত্তা জোট
* কৌশলগত অংশীদারিত্ব
রয়েছে।
একদিকে- ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
অন্যদিকে- পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়ানো
এই দুই লক্ষ্য সবসময় একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।
ফলে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত আগামী পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আঞ্চলিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রভাব দেখা যেতে পারে সমুদ্রপথে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর।
বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
যদি-
* জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়
* সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়
* বাণিজ্যিক রুট ঝুঁকির মুখে পড়ে
তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই চাপের মুখে পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক বৈশ্বিক প্রভাব সাধারণত তেলের বাজারে দেখা যায়।
* সম্ভাব্য প্রভাব
* জ্বালানির দাম বৃদ্ধি
* পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি
* খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি
* সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ
উন্নয়নশীল দেশগুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
চীন এবং রাশিয়া সরাসরি সংঘাতে জড়িত না হলেও পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে।
* জ্বালানি নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ
* মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ
পশ্চিমা মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাওয়া কৌশলগতভাবে উপকারী হতে পারে
ফলে সংঘাতের প্রতিটি ধাপ বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করছে।
যদিও ঝুঁকি রয়েছে, তবুও কয়েকটি বিষয় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
১. অর্থনৈতিক মূল্য অত্যন্ত বেশি- যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২. আঞ্চলিক দেশগুলোর অনীহা- অনেক রাষ্ট্রই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়।
৩. আন্তর্জাতিক চাপ- বিশ্বশক্তিগুলো সাধারণত বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে আগ্রহী।
৪. পারস্পরিক প্রতিরোধ- সব পক্ষ জানে, পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের ফলাফল অনিশ্চিত এবং ব্যয়বহুল।
সমস্যা হলো, বড় যুদ্ধ সবসময় পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।
অনেক সময়-
* ভুল হিসাব
* অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া
* সীমিত হামলার পাল্টা হামলা
* প্রক্সি গোষ্ঠীর স্বাধীন পদক্ষেপ
পরিস্থিতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা ঠিক এই কারণেই উদ্বেগের।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কাও বাড়ছে।
লেবানন, সিরিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল, সমুদ্রপথ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সবকিছু এখন একই ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটকে আর শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এটি ক্রমশ একটি বহুমাত্রিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে, যার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
প্রশ্নটি তাই শুধু "যুদ্ধ হবে কি হবে না" নয়; বরং "এই উত্তেজনা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কত দূর পর্যন্ত প্রভাবিত করবে", সেটিই এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।