

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়ায় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় ভারতীয় মেডিকেল শিক্ষার্থীরা
প্রতিদিন সন্ধ্যা প্রায় ৮টার দিকে ঢাকার উপকণ্ঠ নিশাত নগরে অবস্থিত ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের ছোট্ট কক্ষটিতে নিজেকে তালাবন্দি করে ফেলেন ফয়সাল খান। দরজায় কেউ কড়া নাড়লে সঙ্গে সঙ্গে খুলে দেন না, আগে কান পেতে শোনেন পরিচিত কণ্ঠ কি না।
ক্যাম্পাসের বাইরে ভিড়ভাট্টা চায়ের দোকান কিংবা বাজার এড়িয়ে চলেন তিনি। বাংলায় সাবলীল নন, আর তাঁর উচ্চারণ থেকেই যে তিনি ভারতীয় , এই পরিচয়টি এখন আড়াল করতে চান তিনি।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের হরিয়ানার নুহ জেলা থেকে বাংলাদেশে আসেন ফয়সাল খান। ভারতে সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে না পারায় বাংলাদেশকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিতে হয়েছিল। শুরুতে ঢাকা তাঁকে আপন করে নিয়েছিল। সহপাঠীদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া কিংবা সপ্তাহান্তে ভ্রমণ, সবই ছিল স্বাভাবিক।
“ওই সময়গুলো পড়াশোনার চাপ থেকে মুক্তি দিত,” বলেন খান। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। বাইরে আর নিরাপদ মনে না হওয়ায় নিজ কক্ষে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।
কলেজ কর্তৃপক্ষ ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের ভেতরেই থাকার পরামর্শ দেয়। সেই পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত। খান বলেন, তিনি যেন বন্দি হয়ে আছেন। যে শহর একসময় দ্বিতীয় বাড়ির মতো মনে হতো, এখন সেখানে নিরাপত্তাবোধ নেই।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৯ হাজারের বেশি ভারতীয় মেডিকেল শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এমন এক সময়ে, যখন দেশটিতে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হয়েছে, বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৬ মাস আগে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর।
২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের পর তিনি ভারতে চলে যান। বাংলাদেশে তাঁকে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হতো।
২০২৪ সালের ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের দায়ে ঢাকার একটি ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত এখনো তাঁকে ফেরত পাঠাতে রাজি হয়নি। এতে বাংলাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
এই ক্ষোভের প্রভাব পড়েছে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ওপর। সম্প্রতি একটি ঘটনায় আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ে।
গত ১৯ ডিসেম্বর ঢাকার বাইরে ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের এক ভারতীয় শিক্ষার্থী স্থানীয় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। তাঁর মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে পুরো ভারতীয় শিক্ষার্থী মহলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপত্তার কারণে বাইরে যাওয়া কমিয়ে দেন।
“পুরো শিক্ষার্থী সমাজই আতঙ্কিত,” বলেন ভৈভব (ছদ্মনাম)। তিনি ২০১৯ সালে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং বর্তমানে ইন্টার্নশিপ করছেন। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি।
“প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি,” বলেন তিনি।
আগে ঢাকা ও আশপাশের শহরগুলোতে অনায়াসে ঘুরে বেড়ালেও এখন সে স্বাচ্ছন্দ্য নেই। বাজার, জনসমাগম এড়িয়ে চলেন তিনি। এমনকি হাসপাতালেও রোগীদের সঙ্গে কথা বলার সময় সতর্ক থাকেন।
নিজের ভারতীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখেন ভৈভব। “একটি ভুল কথা আমাকে টার্গেট বানাতে পারে,” বলেন তিনি।
রাজনীতিতে আগ্রহ না থাকলেও এখন নিয়মিত খবর দেখেন। “প্রতিদিন ঘুমাতে যাই এই অনিশ্চয়তা নিয়ে, আগামীকাল কী হবে,” বলেন ভৈভব।
কেন বাংলাদেশে পড়তে আসেন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা
প্রতি বছর ভারতে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী সরকারি মেডিকেল কলেজের প্রায় ৬০ হাজার আসনের জন্য আবেদন করেন। বেসরকারি কলেজ মিলিয়েও আসনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। ফলে প্রতি ২০ জনে মাত্র একজন সুযোগ পান।
ভারতের বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পুরো কোর্সের খরচ ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৬ হাজার ডলার পর্যন্ত, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে। বাংলাদেশে সেই খরচ তুলনামূলক কম, ৩৮ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ডলার।
ফয়সাল খানের বাবা একজন সরকারি কর্মচারী। ছেলের পড়াশোনার জন্য জীবনের প্রায় সব সঞ্চয় ব্যয় করতে হয়েছে।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি আন্দোলনের সময় পরিস্থিতি ভয়াবহ হলে তিনি দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় টিকিট কিনতে ঢাকার বিমানবন্দরে দুই রাত কাটান। শেষ পর্যন্ত কলকাতায় ফিরতে সক্ষম হন।
অক্টোবরে ফের বাংলাদেশে ফিরে দেখেন পরিস্থিতি বদলে গেছে—ক্লাস ও পরীক্ষা বিলম্বিত, নিরাপত্তাহীনতা রয়েই গেছে।
নতুন করে অস্থিরতা
ডিসেম্বর ১৫-এ ছাত্র আন্দোলনের নেতা শরীফ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকারীরা ভারতে পালিয়েছে। এর পর এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। ঢাকায় ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম সাময়িক বন্ধও রাখতে হয়।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় ভৈভব নিজেকে আরও ঝুঁকিতে মনে করেন। এক পরীক্ষায় নিজের পরিচয় জানার পর পরীক্ষকের আচরণ বদলে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর হিন্দুদের ওপর হামলা বেড়েছে। যদিও ইউনূস সরকার দাবি করছে, এসব হামলা রাজনৈতিক, ধর্মীয় নয়।
আটকে পড়া ডিগ্রি, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ (ছদ্মনাম) জানান, ২০১৮ সালে ভর্তি হয়ে ২০২৪ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু কোভিড ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় তা সম্ভব হয়নি।
“আমরা এখনো আটকে আছি,” বলেন তিনি। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও ভয় মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে বলেও জানান তিনি।
অনেক কলেজ শিক্ষার্থীদের চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ