

ইরানের রাজধানী তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ এঙ্গেলাব স্কয়ারে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়ে নতুন একটি দেয়ালচিত্র (ম্যুরাল) উন্মোচন করা হয়েছে। এতে ইরানের ওপর সম্ভাব্য যেকোনো সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
দেয়ালচিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত যুদ্ধবিমানের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। একটি বিমানবাহী রণতরীর ওপর ভেঙে পড়া একাধিক যুদ্ধবিমানের ছবি আঁকার পাশাপাশি ইংরেজিতে লেখা রয়েছে— ‘If you sow the wind, you will reap the whirlwind’। অর্থাৎ, খারাপ কাজের বীজ বুনলে তার ফল হবে ভয়াবহ পরিণতি।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি প্রতীকী শিল্পকর্ম নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে একটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক বার্তা।
এই দেয়ালচিত্রটি এমন এক সময় উন্মোচন করা হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আবারও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) থেকে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দিকে একটি “বিশাল নৌবহর” পাঠাচ্ছে। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, তিনি চান না পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে গড়াক, কিন্তু ইরানের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সরাসরি সতর্ক করে বক্তব্য দেন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর।
তিনি বলেন, আইআরজিসি এখনো “ট্রিগারে আঙুল রেখে” আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রস্তুত রয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে পাকপুর বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা এবং গত বছরের ১২ দিনের সংঘাত থেকে শিক্ষা না নিলে তাদের আরও “বেদনাদায়ক ও অনুশোচনামূলক পরিণতি” ভোগ করতে হবে।
আইআরজিসির এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, তেহরান সামরিকভাবে নিজেদের প্রস্তুতির বিষয়টি প্রকাশ্যে জানিয়ে প্রতিরোধমূলক কৌশল গ্রহণ করছে।
অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, তাদের এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। সেন্টকমের দাবি, এসব যুদ্ধবিমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে ভূমিকা রাখছে এবং যুদ্ধ প্রস্তুতি আরও সুসংহত করছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এঙ্গেলাব স্কয়ারের দেয়ালচিত্রটি সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার ইঙ্গিত না দিলেও এটি একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বার্তা। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই দেয়ালচিত্র ও প্রতীকী শিল্পের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বার্তা একদিকে যেমন দেশীয় জনমত সংহত করার উদ্দেশ্যে দেওয়া, তেমনি অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেওয়া—ইরান সামরিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য ভুল হিসাবও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা। ফলে তেহরানের এই দেয়ালচিত্রকে নিছক শিল্পকর্ম নয়, বরং চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM), ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম