

ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই তাকে সমর্থন দিতে নতুন করে একজোট হয়েছে চীন, রাশিয়া ও ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় এই তিন দেশ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সংকেত দিয়েছে—যা লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরো সরকারের প্রতি সমর্থন দিয়ে এই তিন দেশ শুধু ভেনেজুয়েলাকেই নয়, বরং ওয়াশিংটন-নেতৃত্বাধীন প্রভাববলয়ের বিকল্প কেন্দ্র গড়ে তুলতে চায়। তেলসম্পদে সমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলা তাদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চীন ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ও অন্যতম ঋণদাতা। তেল ও অবকাঠামো খাতে কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলারের চুক্তি রয়েছে।
চীন ভেনেজুয়েলা থেকে দীর্ঘমেয়াদি তেল-পরিশোধ মডেলে ঋণ আদায় করছে।
অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পে নতুন করে সহযোগিতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে বেইজিং।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল। তবে সমালোচনা রয়েছে—এই ঋণনির্ভরতা ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে (সূত্র: Reuters, Brookings Institution)।
রাশিয়া বহু বছর ধরে কারাকাসের নির্ভরযোগ্য মিত্র।
অস্ত্রচুক্তি, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সহায়তা দুই দেশের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
রাশিয়ান তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগ করছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি মস্কোর জন্য লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বজায় রাখার কৌশল; ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত প্রভাববলয়ে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয় (সূত্র: Carnegie Endowment, BBC)।
নিজেই দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করে আসা ইরান এখন সেই অভিজ্ঞতা ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ভাগ করছে।
রিফাইনারি সংস্কার,
জ্বালানি বিনিময় (barter) ব্যবস্থা,
বিকল্প আর্থিক লেনদেন — এসবের মধ্য দিয়ে তেল সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ—এভাবে নিষেধাজ্ঞা পরিহারের নতুন পথ তৈরি হচ্ছে। তবে কারাকাস ও তেহরান বলছে—এটি বৈধ বাণিজ্যিক সহযোগিতা (সূত্র: Al Jazeera, Associated Press)।
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বড় তেলমজুত নিয়ে বসে আছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তাই আঞ্চলিক নয়—বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও অভিবাসন স্রোতের পরও নিরাপত্তা কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে মাদুরো ক্ষমতায় আছেন (সূত্র: International Crisis Group, UNHCR)।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ দাবি করছে—ভেনেজুয়েলায় অবাধ নির্বাচন ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তাই নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত।
বিপরীতে মাদুরো প্রশাসনের বক্তব্য—এটি “অন্যায় অবরোধ” এবং দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ।
ফলে বিষয়টি এখন কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়—গ্লোবাল শক্তির টানাপোড়েন হিসেবেও দেখা হচ্ছে (সূত্র: The Guardian, U.S. State Department briefings)।
১️⃣ স্বল্পমেয়াদি সুরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা
চীন–রাশিয়া–ইরানের সহায়তা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বস্তি দিলেও, অতিনির্ভরতা ভেনেজুয়েলার নীতিনির্ধারণ সীমিত করতে পারে।
২️⃣ নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল কতটা টেকসই?
বিকল্প লেনদেন পদ্ধতি তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়, কিন্তু বৈধ বাজারে প্রবেশ আরও কঠিন করতে পারে।
৩️⃣ আঞ্চলিক প্রভাব
লাতিন আমেরিকার দেশগুলো নতুন সমীকরণে সতর্ক কূটনীতি করছে। ভারসাম্যহীনতা বাড়লে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভিবাসন চাপ আরও বাড়তে পারে।
৪️⃣ সংস্কার ছাড়া সমাধান কঠিন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—শুধু বাহ্যিক সমর্থনে নয়, কর-সংস্কার, উৎপাদন বহুমুখীকরণ ও স্বচ্ছতা ছাড়া স্থায়ী সমাধান মিলবে না (সূত্র: IMF regional outlook, World Bank papers)।
চীন–রাশিয়া–ইরানের জোটমুখী সমর্থন মাদুরো সরকারের জন্য এখন বড় রাজনৈতিক অক্সিজেন। তবে এর বিনিময়ে ভেনেজুয়েলাকে যে মূল্য দিতে হবে—অর্থনৈতিক নির্ভরতা, কূটনৈতিক মেরুকরণ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা—সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংকটও ডেকে আনতে পারে।