জাতিসংঘের অকার্যকারিতা: বড় সংকটে বিশ্ব সংস্থা কেন বারবার ব্যর্থ?

জাতিসংঘের অকার্যকারিতা: বড় সংকটে বিশ্ব সংস্থা কেন বারবার ব্যর্থ?
প্রকাশিত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল- বিশ্বে আর কখনো গণহত্যা, আগ্রাসন ও মানবিক বিপর্যয় যেন না ঘটে, তার নাম ছিল জাতিসংঘ।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে সেই স্বপ্ন আজ প্রশ্নবিদ্ধ। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, সুদান ও ইয়েমেনের মানবিক বিপর্যয়, আফগানিস্তানে নারীর অধিকার ধ্বংস, জলবায়ু সংকট, প্রায় প্রতিটি বড় বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘকে দেখা যাচ্ছে অসহায়, বিভক্ত কিংবা নীরব।

প্রশ্নটি এখন আর আবেগী নয়, বরং কাঠামোগত ও বাস্তব:

বিশ্বের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সংস্থাটি কেন বারবার বড় সংকটে ব্যর্থ হচ্ছে?

সংকটের তালিকা দীর্ঘ, কার্যকর পদক্ষেপ সংক্ষিপ্ত

বর্তমান বিশ্বে সংকটের অভাব নেই-

  • ইউক্রেন যুদ্ধে হাজার হাজার প্রাণহানি, অথচ যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ কার্যত অচল

  • গাজায় মানবিক বিপর্যয়, কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ বিভক্ত

  • সুদান, কঙ্গো, ইয়েমেন, যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ একসঙ্গে চললেও আন্তর্জাতিক চাপ দুর্বল

  • জলবায়ু পরিবর্তনে অস্তিত্ব সংকটে দ্বীপ রাষ্ট্র, অথচ বাধ্যতামূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থা নেই

এই বাস্তবতা জাতিসংঘকে একটি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে- এটি কি আদৌ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে, নাকি শুধু উদ্বেগ প্রকাশের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে?

ভেটো রাজনীতি: অকার্যকারিতার মূল শিকড়

জাতিসংঘের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা।

পাঁচ স্থায়ী সদস্য- যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স, নিজেদের জাতীয় স্বার্থে যেকোনো প্রস্তাব আটকে দিতে পারে।

ফলাফল কী?

  • ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেই

  • গাজা সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো

  • সিরিয়ায় রাশিয়া ও চীনের ভেটো

  • ইয়েমেনে আঞ্চলিক মিত্রদের প্রশ্নে নীরবতা

জাতিসংঘ এখানে বিশ্ব বিবেকের প্রতিনিধি নয়, বরং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার আয়না হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘ কি আসলে ক্ষমতাহীন?

একটি কঠিন সত্য হলো, জাতিসংঘের নিজের কোনো সেনাবাহিনী নেই, নিজস্ব অর্থনৈতিক বলপ্রয়োগের ক্ষমতাও নেই। এটি পুরোপুরি নির্ভরশীল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছার ওপর।

  • শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাতে হলে রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি দরকার

  • নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে বড় শক্তির সমর্থন প্রয়োজন

  • মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা সীমিত

অর্থাৎ জাতিসংঘ ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং ক্ষমতার সমন্বয় মঞ্চ, আর সেই মঞ্চে যখন ঐকমত্য নেই, তখন অচলাবস্থা অনিবার্য।

সমসাময়িক সংকট: জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতার বাস্তব চিত্র

১. গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য

মানবিক বিপর্যয় স্পষ্ট, কিন্তু যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, এটি জাতিসংঘের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে।

২. ইউক্রেন যুদ্ধ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নিন্দা প্রস্তাব পাস হলেও, যুদ্ধ থামানোর মতো বাস্তব প্রভাব তৈরি হয়নি।

৩. আফগানিস্তানে নারীর অধিকার

শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিষিদ্ধ করা হলেও জাতিসংঘ কার্যত পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়।

৪. জলবায়ু সংকট

সম্মেলন, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু বাধ্যতামূলক কাঠামো নেই, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো একা পড়ে যাচ্ছে।

পশ্চিমা নেতৃত্ব বনাম গ্লোবাল সাউথের অসন্তোষ

জাতিসংঘ আজ আর শুধু কার্যকারিতার সংকটে নয়, বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটেও ভুগছে।

গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ মনে করে-

  • জাতিসংঘ পশ্চিমা স্বার্থে বেশি সংবেদনশীল

  • আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব কম

  • নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো ঔপনিবেশিক যুগের প্রতিফলন

এই অসন্তোষই বিকল্প জোট ও আঞ্চলিক শক্তিকে উৎসাহ দিচ্ছে।

তাহলে কি জাতিসংঘ অপ্রাসঙ্গিক?

না, জাতিসংঘ এখনো প্রয়োজনীয়। কারণ-

মানবিক সহায়তা, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও শিশু অধিকার, এই খাতে জাতিসংঘ অপরিহার্য

এটি এখনো একমাত্র বৈশ্বিক আলোচনার সর্বজনীন মঞ্চ।

যুদ্ধ না থামাতে পারলেও, যুদ্ধের সীমা নির্ধারণে এর ভূমিকা আছে

কিন্তু সমস্যা হলো- যেখানে শক্তি দরকার, সেখানে এটি দুর্বল; আর যেখানে আলোচনা দরকার, সেখানে শক্তিধররা অনাগ্রহী।

সংস্কার না হলে ভবিষ্যৎ কী?

জাতিসংঘ যদি নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে চায়, তাহলে-

  • নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার

  • ভেটো ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

  • গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি

  • মানবাধিকার লঙ্ঘনে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা

এসব ছাড়া ভবিষ্যতে জাতিসংঘ আরও বেশি প্রতিক্রিয়াশীল, কিন্তু কম প্রভাবশালী হয়ে পড়বে।

ব্যর্থতার দায় কার?

জাতিসংঘ ব্যর্থ হচ্ছে, এটি সত্য।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যর্থ সংস্থা কি আসলে রাষ্ট্রগুলোরই প্রতিচ্ছবি নয়?

যে বিশ্বে শক্তিই ন্যায় নির্ধারণ করে, সেখানে কোনো সংস্থাই তার সীমা অতিক্রম করতে পারে না। জাতিসংঘ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে-

বিশ্বব্যবস্থা বদলানো ছাড়া কোনো বিশ্ব সংস্থাকে কার্যকর করা সম্ভব নয়।

আজ জাতিসংঘ একটি আয়না।

এই আয়নায় দেখা যায়, আমাদের বিভক্ত বিশ্ব, দ্বিমুখী নীতি এবং নৈতিক সাহসের অভাব।

প্রশ্ন তাই শুধু জাতিসংঘকে নয়, আমাদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে:

আমরা কি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব চাই, নাকি শুধু সংকটে পড়ে অভিযোগ করার একটি মঞ্চ?

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com