

যুদ্ধের দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি আমরা সহজেই দেখি- ভাঙা বাড়ি, ধ্বংসস্তূপ, রক্তাক্ত দেহ। কিন্তু যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতটি অনেক সময় চোখে পড়ে না।
ফিলিস্তিনে সেই অদৃশ্য ক্ষত বহন করছে শিশুরা,যাদের শৈশব কেটেছে বোমার শব্দে, যাদের ঘুম ভেঙেছে আতঙ্কে, আর যাদের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠছে এক গভীর মানসিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে।
এই সংকট শুধু মানবিক নয়; এটি একটি প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক ভাঙনের গল্প।
শৈশব যেখানে নিরাপদ নয়
ফিলিস্তিনি শিশুদের বড় হওয়া মানে কেবল বয়স বাড়া নয়, এটি প্রতিদিন নতুন করে ভয় শেখা। আকাশে ড্রোনের গুঞ্জন, হঠাৎ বিস্ফোরণ, রাতের অন্ধকারে অভিযান, এই অভিজ্ঞতাগুলো তাদের মানসিক জগতে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। শিশু মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা, যেখানে আতঙ্ক কখনো শেষ হয় না, কেবল রূপ বদলায়।
শিশুরা যেসব বয়সে খেলাধুলা, কল্পনা ও শেখার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার কথা, সেই সময়েই তারা শিখছে কীভাবে ভয়কে সঙ্গী করে বাঁচতে হয়।
ট্রমার নীরব উপসর্গ
এই মানসিক বিপর্যয় সবসময় কান্না বা চিৎকারে প্রকাশ পায় না। অনেক শিশুই চুপচাপ হয়ে যায়, কথা বলা কমিয়ে দেয়, আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন আসে। ঘুমের সমস্যা, দুঃস্বপ্ন, বিছানা ভেজানো, অতিরিক্ত চমকে ওঠা, এসব লক্ষণ তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায় আত্মবিশ্বাস হারানো, মনোযোগের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তা। এসব শিশুদের কাছে ‘আগামীকাল’ একটি ভয়ের শব্দ, কোনো স্বপ্নের প্রতিশ্রুতি নয়।
শিক্ষা যখন ট্রমার কাছে হার মানে
যুদ্ধের কারণে স্কুল বন্ধ হওয়া ফিলিস্তিনে নতুন কিছু নয়। কিন্তু স্কুল চালু থাকলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিশুরা সেখানে কার্যকরভাবে শিখতে পারে না। ক্লাসরুমের দেয়াল তাদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় নয়; বরং বাইরের বিস্ফোরণের শব্দ ভেতরের ভয়কে আরও উসকে দেয়।
শিক্ষা–বঞ্চনা এখানে কেবল পাঠ্যবইয়ের ক্ষতি নয়, এটি একটি পুরো প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে।
পরিবারও ভেঙে পড়ে
শিশুর মানসিক সুস্থতার প্রথম আশ্রয় পরিবার। কিন্তু যুদ্ধ ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকেও ভেঙে দিয়েছে। অভিভাবকেরা নিজেরাই ট্রমাগ্রস্ত, নিরাপত্তাহীন ও অসহায়। ফলে তারা সন্তানদের প্রয়োজনীয় মানসিক সাপোর্ট দিতে পারছেন না।
এভাবে ট্রমা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে, একটি অদৃশ্য উত্তরাধিকার হিসেবে।
সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সহিংসতা ধীরে ধীরে শিশুদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যু, রক্তপাত ও ধ্বংস তাদের দৈনন্দিন কথোপকথনের অংশ হয়ে উঠছে। এতে সহমর্মিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, একই সঙ্গে রাগ ও প্রতিশোধের অনুভূতি জমে ওঠে।
এই মানসিক গঠন ভবিষ্যতে সমাজকে আরও সহিংস ও অস্থির করে তুলতে পারে।
বিশ্বব্যবস্থার নীরব দায়
ফিলিস্তিনি শিশুদের মানসিক বিপর্যয় কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফল। যুদ্ধবিরতির আলোচনা, কূটনৈতিক বিবৃতি কিংবা ত্রাণ সহায়তা- সবই সাময়িক। শিশুদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রায় অনুপস্থিত।
বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির হিসাব যত জটিল হয়, মানবিক সংকট ততই পেছনে পড়ে যায়। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সেখানে সবচেয়ে অবহেলিত অধ্যায়।
আরোগ্যের পথ কি আছে?
আশার আলো সম্পূর্ণ নিভে যায়নি। নিরাপদ পরিবেশ, নিয়মিত মানসিক সহায়তা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, এসবের মাধ্যমে ট্রমা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, অবিচ্ছিন্ন সহায়তা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
শুধু চিকিৎসা নয়, শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব ফিরিয়ে দেওয়াই হবে প্রকৃত আরোগ্য।
শেষ কথা
ফিলিস্তিনে যুদ্ধের ক্ষতি শুধু ধ্বংসস্তূপে মাপা যায় না।
এর সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি লুকিয়ে আছে শিশুদের মনে- যেখানে ভয় বাসা বেঁধেছে, স্বপ্ন সংকুচিত হয়েছে, আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
এই শিশুদের মানসিক বিপর্যয় যদি আজ উপেক্ষিত থাকে, তাহলে আগামী দিনের ফিলিস্তিন শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও এক ভাঙা ভূখণ্ডে পরিণত হবে। প্রশ্ন তাই কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি মানবতার পরীক্ষা।