

ইউরোপ নিজেকে দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। ‘গ্রিন ডিল’, কার্বন নিরপেক্ষতার অঙ্গীকার, পরিবেশবান্ধব কৃষি, সবকিছু মিলিয়ে ইউরোপ যেন ভবিষ্যৎ বিশ্বের নকশাকার। কিন্তু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী নীতির নিচেই জন্ম নিচ্ছে এক গভীর সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট, যার নাম ইউরোপের কৃষক আন্দোলন।
২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হয়ে ২০২৪ ও ২০২৫ জুড়ে ইউরোপের প্রায় সব বড় অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধ দেশ ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ইতালি, পোল্যান্ডে রাস্তায় নেমেছে হাজার হাজার কৃষক। ট্রাক্টর অবরোধে অচল হয়েছে রাজধানী, বন্ধ হয়েছে সীমান্ত, স্থবির হয়েছে সরবরাহব্যবস্থা। প্রশ্ন একটাই: জলবায়ু রক্ষার খরচ কি কৃষকরাই একা বহন করবে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘গ্রিন ডিল’ ও কৃষিনীতি সংস্কার (CAP Reform) কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে চায়, নাইট্রোজেন নিঃসরণ সীমিত করতে চায়, জমি আংশিক পতিত রাখার নির্দেশ দেয়। কাগজে এসব নীতি পরিবেশবান্ধব ও ভবিষ্যতমুখী। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন।
কৃষকদের অভিযোগ-
উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু ন্যায্য মূল্য বাড়েনি
পরিবেশগত বিধিনিষেধ মানতে গিয়ে উৎপাদন কমছে
রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি জটিল ও অসম
নীতিনির্ধারণে কৃষকদের কণ্ঠ উপেক্ষিত
নেদারল্যান্ডসে নাইট্রোজেন নীতির কারণে হাজারো খামার বন্ধের ঝুঁকিতে পড়ে। ফ্রান্সে কৃষকরা বলেন, “আমরা পরিবেশ ধ্বংসকারী নই, কিন্তু আমাদেরই অপরাধী বানানো হচ্ছে।”
ইউরোপের কৃষকরা হঠাৎ করে রাস্তায় নামেননি। এটি বহুদিনের জমে থাকা অসন্তোষের বিস্ফোরণ। মূল কারণগুলো স্পষ্ট:
১. কঠোর পরিবেশগত বিধিনিষেধ
ইইউর ‘গ্রিন ডিল’ ও কৃষিনীতির আওতায়-
সার ও কীটনাশক ব্যবহারে কড়াকড়ি
জমির একটি অংশ অনাবাদি রাখতে বাধ্যবাধকতা
পশুপালনে নিঃসরণ কমানোর চাপ
এই নীতিগুলো পরিবেশবান্ধব হলেও কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে, কিন্তু আয়ের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
২. উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, লাভ কমে যাওয়া
জ্বালানি, সার, বিদ্যুৎ ও যন্ত্রপাতির দাম বেড়েছে। অথচ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য কৃষক পাচ্ছে না।
ফলে কৃষকদের অভিযোগ-
নীতির বোঝা আমাদের ঘাড়ে, কিন্তু বাজারের সুবিধা করপোরেটদের হাতে।
৩. সস্তা আমদানি ও বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতা
ইইউর বাইরে থেকে কৃষিপণ্য আমদানি হচ্ছে তুলনামূলক কম দামে, যেখানে পরিবেশগত মানদণ্ড অনেক শিথিল।
কৃষকদের প্রশ্ন- আমাদের ওপর এত নিয়ম, অথচ বাইরে থেকে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে এত ছাড় কেন?
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ ইউক্রেনীয় কৃষিপণ্যে শুল্ক ছাড় দেয়। উদ্দেশ্য ছিল কিয়েভকে অর্থনৈতিক সহায়তা। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গিয়ে পড়ে ইউরোপীয় কৃষকদের ওপর।
শস্য, গম, ভুট্টা, মুরগি, সব ক্ষেত্রেই ইউক্রেনীয় সস্তা পণ্যে বাজার ভরে যায়। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়ায় স্থানীয় কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। তাদের প্রশ্ন, যুদ্ধের খেসারত আমরা কেন দেব?
এখানেই কৃষক আন্দোলন পরিবেশ ইস্যু ছাড়িয়ে ভূরাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নে রূপ নেয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে-
নীতি শিথিল করলে জলবায়ু নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত
কঠোর থাকলে কৃষক অসন্তোষ আরও বাড়বে
এরই মধ্যে কিছু দেশে সরকার-
পরিবেশগত নিয়ম সাময়িক শিথিল করছে
ভর্তুকি ও কর ছাড় বাড়াচ্ছে
নীতির সময়সীমা পিছিয়ে দিচ্ছে
কিন্তু এগুলো সমাধান নয়, বরং সংকট সামলানোর অস্থায়ী কৌশল।
না। এটি এখন স্পষ্টতই রাজনৈতিক আন্দোলন।
ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী ও পপুলিস্ট দলগুলো কৃষকদের ক্ষোভকে পুঁজি করছে। “গ্রিন এলিট বনাম গ্রামীণ জনগণ”, এই বয়ান দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। ২০২৪ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে কৃষক আন্দোলনের প্রভাব সরাসরি ভোটে প্রতিফলিত হয়।
এখানে সংকট শুধু কৃষির নয়; সংকট হলো ইউরোপীয় শাসনব্যবস্থার বৈধতা। নীতিনির্ধারণ কি বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত, নাকি শুধু ব্রাসেলসের কাগুজে কৌশল?
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব। জলবায়ু রক্ষা ও কৃষকের জীবিকা একে অপরের শত্রু নয়। কিন্তু সমস্যা হয়েছে নীতির বাস্তবায়নে।
জলবায়ু নীতির বোঝা যদি শুধু কৃষকের কাঁধে চাপানো হয়, আর বড় কর্পোরেট কৃষি ও বহুজাতিক খাদ্য কোম্পানি ছাড় পায়, তাহলে প্রতিবাদ অনিবার্য।
ইউরোপের কৃষক আন্দোলন বিশ্বকে তিনটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে-
১. জলবায়ু নীতি সামাজিক ন্যায় ছাড়া টেকসই নয়
২. নীতিনির্ধারণে গ্রামীণ বাস্তবতা উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসবেই
৩. সবুজ রূপান্তর যদি অংশগ্রহণমূলক না হয়, তা গণতন্ত্রকেই দুর্বল করে
ইউরোপ আজ এক সন্ধিক্ষণে। একদিকে জলবায়ু সংকট, অন্যদিকে নাগরিক জীবিকার চাপ। কৃষক আন্দোলন কোনো পশ্চাৎমুখী প্রতিরোধ নয়; এটি একটি সতর্ক সংকেত, পরিবর্তন চাপিয়ে দিলে নয়, সহমতের ভিত্তিতে আনতে হয়।
ইউরোপ যদি এই বার্তা না শোনে, তবে কৃষকের ট্রাক্টর শুধু রাস্তাই নয়, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক মানচিত্রও বদলে দিতে পারে।