

বিশ্ব রাজনীতি যখন দ্রুত মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে, তখন কিছু সম্পর্ক নিছক কূটনৈতিক সমীকরণ নয়, বরং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত বহন করে। রাশিয়া ও ইরানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ঠিক তেমনই একটি সম্পর্ক।
প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কৌশলগত সুবিধার সাময়িক সমঝোতা, নাকি পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো এক নতুন জোটের সূচনা?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ক শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরেশিয়া এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
রাশিয়া ও ইরান, দুটি দেশই দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে। এই অভিন্ন অভিজ্ঞতা তাদের একে অপরের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের জন্য দরজা বন্ধ করেছে, সেখানে তারা একে অপরকে দেখছে বিকল্প কৌশলগত অংশীদার হিসেবে।
রাশিয়ার জন্য ইরান হলো মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ সেতু। অন্যদিকে ইরানের কাছে রাশিয়া একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ঢাল। যে ঢাল জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বৈশ্বিক রাজনীতির নানা মঞ্চে কাজ করে।
এই ঘনিষ্ঠতার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো সামরিক সহযোগিতা। অস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা কৌশল ও গোয়েন্দা সহযোগিতায় দুই দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা বদলাচ্ছে না; বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোকেও নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এই সহযোগিতা পশ্চিমা বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করছে, কারণ এটি প্রমাণ করে, নিষেধাজ্ঞা সবসময় সামরিক সক্ষমতা থামাতে পারে না, বরং বিকল্প জোট গঠনের পথ খুলে দেয়।
রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা। জ্বালানি, ব্যাংকিং, পরিবহন ও বাণিজ্যে তারা বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। যার লক্ষ্য একটাই: পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানো।
ডলার নির্ভরতা কমানো, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং বিকল্প বাণিজ্য রুট তৈরি, এসব উদ্যোগ দেখাচ্ছে যে এই সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং কাঠামোগত রূপ নিচ্ছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছে। রাশিয়া সিরিয়া সংকটের মাধ্যমে সেখানে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এই দুই শক্তির সমন্বয় মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে।
এতে করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য অঞ্চলটিতে কৌশলগত চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য করছে, কার সঙ্গে কতটা দূরত্ব বা ঘনিষ্ঠতা রাখা হবে।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হলেও এটি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়। তাদের স্বার্থ সব সময় এক নয়। ইতিহাস বলছে, দুই দেশই সুযোগ বুঝে নিজেদের কৌশল বদলাতে দ্বিধা করে না।
তবু বর্তমান বাস্তবতায় তাদের ঘনিষ্ঠতা কেবল প্রয়োজনের বন্ধুত্ব নয়। এটি একটি কার্যকর কৌশলগত সমন্বয়, যা পশ্চিমা প্রভাবকে মোকাবিলার লক্ষ্যে গড়ে উঠছে।
রাশিয়া-ইরান ঘনিষ্ঠতা একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে- বিশ্ব আর একক শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগের রাজনীতি যত বাড়ছে, ততই বিকল্প জোট ও সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
এটি একটি বহুমেরু বিশ্বের ইঙ্গিত, যেখানে আদর্শের চেয়ে বাস্তব স্বার্থই সম্পর্ক নির্ধারণ করছে।
এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে, আবার পরিস্থিতির পরিবর্তনে সীমিতও হয়ে যেতে পারে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, রাশিয়া ও ইরান এখন আর বিচ্ছিন্ন খেলোয়াড় নয়। তারা একে অপরকে ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
এই ঘনিষ্ঠতা বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত। কারণ এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, যেখানে চাপ দেওয়া হয়, সেখানেই বিকল্প শক্তির জন্ম হয়।
রাশিয়া-ইরান সম্পর্ককে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি কোনো আকস্মিক কূটনৈতিক বন্ধুত্ব নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাতের বাস্তব ফলাফল। নতুন জোটের জন্ম হোক বা না হোক, এই ঘনিষ্ঠতা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথে গভীর ছাপ ফেলেছে।
বিশ্ব এখন সেই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে পুরোনো মিত্রতা ভাঙছে, নতুন সমীকরণ গড়ে উঠছে।
আর রাশিয়া-ইরান ঘনিষ্ঠতা সেই পরিবর্তনেরই স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।